রহস্যের আড়ালে থাকা ইতিহাসের সাতটি অমীমাংসিত রহস্য…

0
329

ইতিহাসের কিছু গল্প বা ঘটনা রহস্যের আড়ালেই রয়ে গেছে সবসময়। কখনোই সেসব রহস্যের সমাধান মেলেনি, কখনো মিলবে এমন সম্ভাবনাও ক্ষীণ। ঐতিহাসিক সেসব বিষয়ের নমুনা বা প্রমাণ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সেসব রহস্য রহস্যের আড়ালেই থেকে যাবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। সেরকম সাতটি রহস্য নিয়েই আমাদের আজকের আয়োজন-

. কে ছিল ‘জ্যা দ্য রিপার’?

‘জ্যাক দ্যা রিপার’ ইতিহাসের একজন কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার। ১৮৮৮ সালে লন্ডনের কমপক্ষে পাঁচ জন মহিলাকে হত্যা করে বিশ্রীভাবে তাদের অঙ্গ ব্যবচ্ছেদ করে ভয়ঙ্কর এই লোকটি। “জ্যাক দ্যা রিপার” লোকটার আসল নাম নয়। সে সময় তাকে ধরার উদ্দেশ্যে পুলিশের ব্যর্থ চেষ্টাকে বিদ্রুপ করে লেখা কিছু চিঠি আসে লন্ডন পুলিশের কার্যালয়ে। চিঠিতে প্রেরক হিসেবে খুনির নাম থাকলেও চিঠিগুলো কে লিখেছিল এ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অনেকে মনে করেন, চিঠির ব্যাপারটা পুরোটাই ধাপ্পাবাজি। জার্নালিস্টরা এই খুনের ঘটনাকে হাইলাইট করার জন্য এবং তাদের পত্রিকার সার্কুলেশন বাড়ানোর জন্য চিঠিগুলো পাঠিয়েছিল। এই চিঠিগুলো থেকেই “জ্যাক দ্যা রিপার” নামটির উৎপত্তি। “জ্যাক দ্যা রিপার” ছাড়াও এ খুনি “দ্যা হোয়াইটচ্যাপল মার্ডারার” বা ‘লেদার এ্যাপ্রন’ নামেও পরিচিতি পেয়েছিল।

এই বিকৃত মানসিকতার ভয়ঙ্কর খুনি কে ছিল তা কখনোই জানা যায় নি। বছরের পর বছর ধরে অনেক লোককেই সন্দেহের তালিকায় রাখা হলেও নিশ্চিত হওয়া যায়নি কে ছিল এই জ্যাক দ্যা রিপার। সাম্প্রতিক একটা বইতে, লিজি উইলিয়াম নামের একজন মহিলাকে রিপার বলে দাবি করা হয়। অবশ্য অন্য সব রিপার বিশেষজ্ঞরা এই দাবির সাথে একমত হতে পারেনি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এতদিন যাবত যেহেতু এই রহস্যের কোন সমাধান পাওয়া যায়নি, তাই নিশ্চিতভাবে আর কখনোই জানা যাবে না কে ছিল এই খুনি “জ্যাক দ্যা রিপার”!

. কোথায় সমাহিত করা হয়েছিল ক্লিওপেট্রাকে?

ঐতিহাসিকদের মতে, খিস্টপূর্ব ৩০ অব্দে মিশরের রাণী ক্লিওপেট্রা ও তার প্রেমিক আন্টনিওর মৃত্যুর পরে তাদের একসাথে একই কবরে সমাহিত করা হয়। প্লুটার্চ নামক একজন লেখক ৪৫-১২০ খিস্টাব্দের মধ্যে কোন একসময় তার একটি লেখায় ক্লিওপেট্রা ও আন্টনিওর সমাধিসৌধের বর্ণনা দেন। তিনি লেখেন, তাদের কবর হয়েছিল মিশরীয় দেবী আইসিসের মন্দিরের পাশে। সমাধিসৌধটি ছিল খুবই নয়নাভিরাম ও আড়ম্বরপূর্ণ, যার মধ্যে অনেক ধন-সম্পদ রাখা হয়েছিল। সমাধিসৌধটি তৈরি করা হয়েছিল সোনা, রুপা, চুনি-পান্না, মুক্তা, আবলুস কাঠ ও হাতির দাঁত দিয়ে!

সেই সমাধিসৌধটি যে কোথায় তা আজ পর্যন্ত কেউ খুঁজে বের করতে পারেনি। ২০১০ সালে মিশরের সাবেক পুরাতত্ত্ব বিষয়ক মন্ত্রী জাহি হাওয়াস, ক্লিওপেট্রার সমাধিটি খুঁজে বের করার জন্য আলেকজান্দ্রিয়ার (বর্তমান টাপোসিরিস ম্যাগনা) পাশে একটি এলাকায় খনন কার্য পরিচালনা করেন। এলাকাটিতে ক্লিওপেট্রার আমলের কয়েকটি সমাধিসৌধ রয়েছে। যদিও সেখানে অনেক চিত্তকর্ষক কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের সন্ধান পাওয়া গেছে, তবে ক্লিওপেট্রার সমাধির কোন হদিস পাওয়া যায়নি বলে হাওয়াস জানান।

প্রত্নতাত্ত্বিকরা মনে করছেন, যদি ক্লিওপেট্রার সমাধি কোথাও থেকেও থাকে, তবে তা এখন আর চিহ্নিত করা সম্ভব নয়। কেননা ধনসম্পদগুলো এত শতাব্দী পর আর অক্ষত থাকার কথা না।

. জন এফ কেনেডিকে হত্যার পেছনের রহস্য কী ছিল?

এটি সম্ভবত আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রহস্য যেটার কখনোই কোন সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া সম্ভব নয়। ১৯৬৩ সালের ২২ নভেম্বর ডালাসে জন এফ কেনেডিকে গুলি করেন লি হার্ভে অসওয়াল্ড নামের একজন ব্যক্তি। ট্রায়ালের জন্য দাঁড়ানোর আগেই ১৯৬৩ সালের ২৪ নভেম্বর অসওয়াল্ড, জ্যাক রুবি নামের এক নাইট ক্লাবের মালিকের হাতে নৃশংসভাবে খুন হন। এই রুবি আবার ৩রা জানুয়ারি ১৯৬৭ ফুসফুসের ক্যান্সারে মারা যায়।

সবচেয়ে বেশি মানুষ যে ব্যাখ্যাটির সাথে সহমত পোষণ করে তা হলো, অসওয়াল্ড নিজ ইচ্ছায় কেনেডিকে হত্যা করেছে। আর রুবিও ব্যক্তিগত বিদ্বেষ থেকেই অসওয়াল্ড কে খুন করেছে। যাই ঘটে থাকুক না কেন, আজ অবধি এ ব্যাখ্যাটি অনেক পেশাদার ঐতিহাসিক থেকে শুরু করে অনেক আনাড়ি লোকও মেনে নিতে পারে নি। তারা বিভিন্ন সময় এ ঘটনার বিভিন্ন রকম ব্যাখ্যা দাঁড় করাবার চেষ্টা করেছেন। কিন্ত সেরকম উল্লেখযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য কোন ব্যাখ্যা আজ পর্যন্ত কেউ দিতে পারেনি। কোন দিন দিতে পারবে, এ সম্ভাবনাও ক্ষীণ।

. ওক আইল্যান্ডে সত্যিই কি আছে সম্পদেরখনি?

দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে কানাডার নোভা স্কোটিয়ার ওক দ্বীপকে নিয়ে একটি গল্প প্রচলিত আছে। গল্পটি হলো, কুখ্যাত জলদস্যু ক্যাপ্টেন উইলিয়াম কিড (১৬৪৫-১৭০১) ওক দ্বীপের কোন এক স্থানে বিপুল পরিমাণ সম্পদ মাটির নিচে লুকিয়ে রেখেছিল। বিভিন্ন সময়ে এই লুকিয়ে থাকা সম্পদের খোঁজে অনেকেই এই দ্বীপে অভিযান চালিয়েছে। কোটি কোটি ডলার খরচ করেছে এই হারিয়ে যাওয়া সম্পদের খোঁজে। কিন্তু এর কোন চিহ্নও কোথাও মেলেনি।

যদিও শত শত বছর ধরে চেষ্টা করেও ওক আইল্যান্ডে কোন সম্পদের সন্ধান মেলেনি, তবুও এখনো এর খোঁজ করা বন্ধ হয়নি। আজও অনেকেই চেষ্টা করে সেই হারিয়ে যাওয়া সম্পদ খুঁজে পেতে।

. কপার স্ক্রলে রেকর্ড করা অর্থভান্ডার কিসত্যিই ছিল?

আরো প্রাচীন একটি অর্থভান্ডার হলো কপার স্ক্রল অর্থভান্ডার। ইসরাইলের কুয়ামরানে একটি গুহায় ডেড সি স্ক্রল নামে খ্যাত ৯০০টি পেঁচানো কাগজ (Scroll) পাওয়া যায়। এর মধ্যে একটি স্ক্রল ছিল তামা বা কপারের তৈরি। সেই স্ক্রলে বিপুল পরিমাণ লুকানো সম্পদের হিসাব ছিল। সেটাতে বর্ণিত সম্পদের পরিমাণ এত বেশি যে, কোন কোন বিশেষজ্ঞ এটার অস্তিত্বই থাকা অসম্ভব বলে মনে করেন।

সেই স্ক্রলটা থেকে জানা যায়, এটি ১৯০০ বছর আগের, রোমান সম্রাটরা কুয়ামরান শাসন করতো সেই সময়ে লেখা। যখন এই স্ক্রল লেখা হয় সেই সময় রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিপ্লব সংগঠিত হয় কুয়ামরানে। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেন রোমান বাহিনীর হাত থেকে রক্ষা করার জন্যই এ বিপুল সম্পদ লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। এরকম কোন অর্থভান্ডার কি সত্যিই ছিল? কোথায় লুকানো ছিল এটি? কখনো কি পাওয়া যাবে এ সম্পদ? অথবা, এখনো কি এর অস্তিত্ব আছে?- এরকম সব প্রশ্নই আজ পর্যন্ত রহস্য হয়ে আছে এবং কখনোই সম্ভবত এ রহস্যের কোন সমাধান পাওয়া যাবে না।

৬. কী ঘটেছিল আর্ক অব দ্য কভেন্যান্টের কপালে?

৫৪৭ খিস্টপূর্বাব্দে সম্রাট নেবুচাঁদনেজারের নেতৃত্বে ব্যাবিলনের সৈন্যবাহিনী জেরুজালেম দখল করে। সে সময় তারা পুরো জেরুজালেমে লুটতরাজ চালায় এবং জেরুজালেমে নির্মিত ইহুদিদের প্রথম মন্দিরটি ধ্বংস করে দেয়। এ মন্দিরেই রাখা ছিল বিখ্যাত ‘দ্যা আর্ক অব দ্যা কভেন্যান্’ বা ”সাক্ষ্য সিন্দুক্” যেটার ভেতরে একটি ফলকে খোদাই করে রাখা ছিল ১০টি নৈতিক উপদেশ।

এই আর্ক বা সিন্দুকের কপালে কি ঘটেছিল সেটা এখনো অস্পষ্ট। প্রাচীন সূত্রগুলো মতে, সিন্দুকটি ব্যাবিলনীয়রা নিয়ে গিয়ে থাকতে পারে অথবা জেরুজালেমে আক্রমণ হওয়ার পূর্বেই ইহুদিরা লুকিয়ে রাখতেও পারে। শহর যখন লুট করা হয়েছিল তখন সিন্দুকই ধ্বংস হয়ে গিয়ে থাকতেও পারে। যাই হোক না কেন, সেটা অজানাই রয়ে গেছে। আর্কটি হারিয়ে যাওয়ার পর থেকেই এটিকে ঘিরে অনেক গল্প-কাহিনী ও উপকথা প্রচলিত আছে। একটি উপকথায় বলা হয়, এটি শেষ পর্যন্ত কোনোভাবে ইথিওপিয়ায় গিয়েছিল এবং বর্তমানে সেখানেই আছে। আবার আরেকটি প্রচলিত কাহিনী মতে, অলৌকিকভাবে কোনো জায়গায় এটি লুকানো রয়েছে এবং খিস্টের আবির্ভাবের পূর্বে সেটা আর দেখা যাবে না।

. কেমন ছিল ব্যাবিলনের শূন্যেদ্যান বা ঝুলন্তউদ্যান?

ঐতিহাসিকদের মতে, প্রাচীন ব্যাবিলন শহরে (বর্তমানে ইরাক) একটা অত্যাশ্চর্য বাগানের সারি নির্মাণ করা হয়েছিল যা ইতিহাসে ব্যাবিলনের শূন্যেদ্যান নামে পরিচিতি পেয়েছে। ঠিক কোন সময়ে এই বাগানটি নির্মাণ করা হয়েছিল তা আজও স্পষ্ট নয়। তবে, প্রাচীন লেখকরা এ বাগানের সৌন্দর্য দেখে এতই বিমোহিত হয়েছিলেন যে তারা এটিকে প্রাচীন পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্য বলে অভিহিত করেন। কনস্ট্যান্টিনোপলের একজন লেখক সেই বাগানের বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেন, বাগানটিতে যে উদ্ভিদ চাষ করা হত সেগুলো মাটি থেকে খানিকটা ওপরে চাষ করা হতো। এবং বাগানের গাছগুলোর মূল মাটিতে ছিল না, ছিল কোন উঁচু স্থানে। এ কারণেই একে শূন্য উদ্যান বা ঝুলন্ত বাগান বলা হয়।

যে প্রত্নতাত্ত্বিকগণ মাটি খুঁড়ে ব্যাবিলনীয় সভ্যতার খোঁজ পেয়েছিলেন তারা কেউই সম্ভবত এ ঝুলন্ত উদ্যানের বর্ণনার সাথে মিল আছে এমন কিছু খুঁজে পাননি। এ কারণেই অনেক প্রত্নতাত্ত্বিকদের মনে প্রশ্ন রয়ে গেছে, আসলেই কি শূন্য উদ্যান বলে কিছু ছিল? ২০১৩ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষক, স্টেফানি ড্যালি তার একটি বইতে দাবি করেন এই বাগানটি ছিল আসিরীয়ান শহর নীনবীতে। গত দুই দশক ধরে চলা যুদ্ধের কারণে ব্যাবিলন এবং নীনবী দুটি শহরেই ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে না যে এই শহর দুটিকে ঘিরে থাকা যে শূন্য উদ্যানের গল্প প্রচলিত আছে সে রহস্যের আর কখনও কোন সুরাহা হবে!

Please comment Here (ভাল লাগলে কমেন্ট করুন)