সড়ক দুর্ঘটনার কারন ও প্রতিকার

0
387

ভুমিকা :-বর্তমান সময়ে সড়ক দুর্ঘটনা আমাদের দেশের একটি জাতীয় সমস্য হয়ে দাড়িয়েছে । ঘর থেকে রাস্তায় বাহির হলেই দেশের প্রত্যেকটি মানুষের মনে একটি আতংক তাড়া করে । প্রতিদিন দেশের কোন না কোন স্হানে সড়ক দুর্ঘটনা গঠে । সকালে সংবাদ পএের পাতাই পাতাই পাওয়া যায় অসংখ্য সড়ক দুর্ঘটনার আহত ও নিহতদের মর্মান্তিক সব সংবাদ এবং এই সড়ক দুর্ঘটনা একটি পরিবারের সারা জীবনের কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায় ।এই সড়ক দুর্ঘটনা আকস্মিক ছিনিয়ে নেয় পরিবারের একমাএ আশা অন্ন- বস্ত্রের সংস্থানকারীকে যাহা কখন কাম্য নয় ।

যোগাযোগ ব্যবস্হা :- বাংলাদেশ সড়ক পথ , নৌপথ , এবং আকাশ পথ ,এই তিন ধরণের যোগাযোগ ব্যবস্হা রয়েছে ।স্বাধীন এই বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর থেকে সড়ক পথে যথেষ্ট উন্নতি সাধিত হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম ।বর্তমানে এদেশে ১১ হাজার কিলোমিটার পাকা রাস্তা রয়েছে এবং প্রায় ৪০ লক্ষ নিবন্ধিত যানবাহন রয়েছে । যাহার মধ্যে প্রায় ১৮ লক্ষ মোটরসাইকেল রয়েছে ।আমাদের পার্শ্ববর্তী অন্য দেশের তুলনাই যানবাহন সংখ্যা অনেক কম । বিশ্ব স্বাস্হ্য সংস্হার গবেষনা অনুসারে বাংলাদেশে প্রতি ১ লক্ষ মানুষের জন্য মাএ  ১ হাজার ১৩৩ টি যানবাহন আছে । বাংলাদেশর প্রতিবেশী দেশ  চীনে ১ লক্ষ জনগনের জন্য ১৮ হাজার যানবাহন , ভারতে ১ লক্ষ জনগনের জন্য ১৩ হাজার যানবাহন , পাকিস্তানে ১ লক্ষ জনগনের জন্য প্রায় ৫ হাজার যানবাহন রয়েছে । এছাড়াও থাইল্যান্ড ,ভিয়েতনাম , ও ইন্দোনেশিয়ায় প্রতি দুইজন মানুষের জন্য ১ টি যানবাহন রয়েছে । এসব দেশের তুলনায় বাংলাদেশে যানবাহন সংখ্যা কম হলেও সড়ক দুর্ঘটনার মাএ অনেক বেশী । বাংলাদেশে নৌপথ ও আকাশ পথে যোগাযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যাম হলেও সার্বিক বিবেচনায় সড়ক পথের যোগাযোগ সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানের রয়েছে । এবং সড়ক পথের গুরুত্ব বাংলাদেশর প্রক্ষাপটে অনেক বেশী ।

সড়ক দুর্ঘটনার ধরন :- প্রতিদিন সংবাদ পএে , online সংবাদ মাধ্যমে , বিভিন্ন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যাম ও টিবি চ্যানেলে যেসব সড়ক দুর্ঘটনার সংবাদ পাওয়া যায় তাহা বিভিন্ন ভাবে গঠে থাকে । যেমন:- যানবাহন গুলোর মুখামুখি সংঘর্ষের ফলে দুর্ঘটনা গঠে , গাড়ী নিয়ন্তণ হারিয়ে খাদে পড়ে সংগঠিত দুর্ঘটনা , একজন চালক অন্যজন চালকের সাথে প্রতিযোগিতা বা ওভারটেকিং  করতে  গিয়ে সংগঠিত সড়ক দুর্ঘটনা হয় । এছাড়াও রাস্তা পার হতে গিয়েও দুর্ঘটনা হয়ে থাকে ।

সড়ক দুর্ঘটনার কারণ :- আমাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য কাউকে একক ভাবে দায়ী করা যাবে না ।নানাবিধ কারণে এই দুর্ঘটনা গঠে থাকে , অকালে ঝরে পড়ে কিছু তাজা প্রাণ ।যেসব কারণে সড়ক দুর্ঘটনা বেশী হয় তা হচ্ছে নিম্নরূপ :—
১) গাড়ী চালকরা বেপরোয়া গতিতে গাড়ী চালানো এবং অন্যের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়ার জন্য ।
২) সড়ক – মহাসড়কে মোটরসাইকেলসহ তিন চাকার যানবাহন চলাচল অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি ।
৩) স্হানীয়ভাবে তৈরী দেশীয় ইন্জিলচালিত ক্ষুদ্রযান যারা যাএী ও পন্য পরিবহন করে আইন না মেনে বিধি লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত পন্য বোঝায় ও অতিরিক্ত যাএী বহন করা ।
৪) প্রয়োজনীয় সংখ্যাক ট্রাফিক পুলিশের অভাব এবং ট্রাফিক আইন যথাযত অনুসরণ না করা ।
৫) একজন গাড়ী চালক দীর্ঘক্ষন বিরতিহীন ভাবে গাড়ী চালানো ।
৬) সড়ক ও মহাসড়কে ঝুকিপূর্ণ বাঁক ও রাস্তার বেহাল অবস্তায় সর্তকত ভাবে গাড়ী না চালানো ।
৭) এুটিপূর্ণ  যানবাহন চলাচলে আইনের যথাযত প্রয়োগের অভাব ।
৮) সাধারণত বেশীভাগ দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ অদক্ষ অযোগ্য ও লাইসেন্সবিহীন চালকের কারণে ।
৯) দায়িত্ব কর্তব্যহীন ভাবে গাড়ী চালানো এবং ওভারটেকিং করার মনোভাব দুর্ঘটনার অন্যতম কারন ।
১০)রাস্তা সল্পতা ও অপ্রশাস্ততা এবং ওভারব্রিজ সল্পতা ।সড়কের ওপর অবৈধ্য হাট – বাজার ।
১১) অসাবধানে রাস্তা পারাপার বা রাস্তা পারাপারের নিয়ম না মানা ।
১২) জনসংখ্যার চাপ এবং অপ্রতুল পরিবহন ব্যবস্হা ।
এছাড়াও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা পথ সভা , পথ অবরোধ , হরতাল ইত্যাদি কারণে  যানজট সৃষ্টির ফলে যানবাহন নিয়ন্তণ কঠিন হয়ে পড়ে ।সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ সরকারের সঠিক সিন্ধান্তের সহ অন্যান্য কারণও
রয়েছে ।

সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতি :- সড়ক দুর্ঘটনার  ক্ষয়ক্ষতি অপুরনীয় এবং অসিম ।এই সড়ক দুর্ঘটনা পারিবারিক ও সামাজিক জীবনকে দুবির্ষহ করে তুলে এবং এর ফলে হঠাৎ করে বিপর্যয় নেমে আসে একটি পরিবারে ।২০১০ সালের বিশ্ব স্বাস্হ্য সংস্হা এর হিসেব মতে সারা পৃথিবীতে প্রায় ১০ লক্ষ ১৮ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয় । ২ কোটির ও বেশী মানুষ আহত হয় এবং ৫০  লক্ষের ও বেশী মানুষ পঙ্গু হয় ।এছাড়াও ১ লক্ষ ৮০ হাজার শিশু মারা যায় যাদের বয়স ১৫ বছরের ও কম ।
বাংলাদেশের যাএীকল্যান সমিতির প্রতিবেদনে বলা হয় ২০১৭ সালে প্রায় ৪ হাজার ৯৭৯ টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশে । এই সব দুর্ঘটনার মধ্যে ৭ হাজার ৩৯৭ জন নিহত এবং ১৬ হাজার ১৯৩ জন আহত হয় ।এর মধ্যে হাত – পা বা অন্য কোন অঙ্গ হারিয়ে পঙ্গু হয়েছে ১ হাজার ৭২২ জন ।২০১৬ সালে ৪ হাজার ৩৩২ টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৬ হাজার ৫৫ জন নিহত ও ১৫ হাজার ৯১৪ জন আহত হয়েছিল ।২০১৬ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে ১৫.৫ শতাংশ , নিহতদের সংখ্যা প্রায় ২২.২ শতাংশ বেড়েছে এবং আহতের সংখ্যা বেড়েছে ১.৮ শতাংশ ।এছাড়াও সড়ক দুর্ঘটনা দেশীর অর্থনৈতিক ও সমাজিক ক্ষেএে ব্যাপক প্রভাব পড়ে । একটি দুর্ঘটনা একটি পরিবারের সারা জীবনের দুক্ষের কারণ হয়ে থাকে ।

সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিকার :-বর্তমান সময়ে সড়ক দুর্ঘগটনা বাংলাদেশে মহামারি আঁকার ধারণ করেছে । এই এখন একটি জাতীয় ব্যাধিতে পরিনত হয়েছে । এর ফলে মা হচ্ছে সন্তান হারা স্তী হচ্ছে স্বামী হারা আর সন্তান হচ্ছে পিতৃহারা । এই সমস্য সামাধানের জন্য কিছু প্রতিকার মুলক ব্যবস্হা নিতে হবে  । সেগুলো হচ্ছে যথা …
১) দেশের প্রতিটা মানুষের ভিতরে সচেতনামূলক শিক্ষার ব্যবস্হা এবং সচেতনা বৃদ্ধি করতে হবে ।কারন যতক্ষন পর্যন্ত মানুষ সচেতন হবে না ততক্ষন  পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনা আইন করে রোধ করা যাবে না ।
২) সড়ক দুর্ঘটনা বন্ধ করার জন্য গাড়ির মালিক গাড়ীর চালক সহ সরকারের আইনের প্রতি সম্মান রেখে এগিয়ে আসতে হবে ।
৩) ট্রাফিক আইনের যথাযত প্রয়োগের মাধ্যমে আইন লঙ্গনকারীর বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্হা করতে হবে ।
৪) বেপরোয়া গাড়ী চালানো ও ওভারটেকিং নিষিদ্ধ করা এবং গাড়ী চালানোর জন্য সর্বউচ্চ গতিসীমা নিধার্রণ করে দিতে হবে ।
৫) অনিধার্রিত স্হানে গাড়ী পার্কিং বন্ধ এবং মহাসড়কে অবৈধভাবে তিন চাকার গাড়ীর অনুপ্রবেশ রোধ করা ।
৬) চালকদের লাইসেন্স প্রদানের আগে পরিক্ষার মাধ্যমে চালকদের দক্ষতা ও যোগ্যতা যাচাই করা । এবং লাইসেন্স প্রদানের জালিয়াতি প্রতিরোধ করা ।
৭) গাড়ী রাস্তায় বের হওয়ার আগে যান্ত্রিক কার্যকারিতা আছে কি না দেখা । এবং প্রতি মাসে মোবাইল কোর্টের ব্যবস্হা করে যানবাহনের যান্ত্রিক বিচ্যুতি আছে কি তা পরীক্ষা করা ।
৮) দন্ডবিধি আইনের সংশোধন করে বেপরোয়া গাড়ী চালকের শাস্তি এবং মোটরযান আইনের জরিমানা বৃদ্ধি করতে হবে । নিরাপদ সড়ক আইন কার্যকর করতে হবে ।
৯) ফুটপাত হকারদের দখল মুক্ত করে পথচারীদের চলাচলের উপযোগী করতে হবে । এবং পথচারীদের সর্তক ভাবে চলাফেরা করতে হবে ।
১০) গাড়ীতে  উঠা – নামা করার সময় যাএীদের সর্তক থাকতে হবে । অতিরিক্ত যাএী ও মালামাল বহন বন্ধ করতে
হবে ।
১১) মহাসড়কের পাশে হাট – বাজার ও অবৈধ স্হাপনা উচ্ছেদ করতে হবে । এবং রাস্তা প্রশাস্ত করতে হবে ।
১২) সর্বাপরি গাড়ী চালক ও আমাদের সবার মনে রাখতে হবে সময়ের চেয়ে জীবনের মুল্য অনেক বেশী ।
এছাড়াও সরকারের উদ্দেগের পাশাপাশি পরিবহন মালিক ,শ্রমিক , চালক , পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়ন সম্মলিত প্রচেষ্টা এবং সবার মাঝে আইন মেনে চলার প্রবনতা বৃদ্ধি করার মাধ্যমে এই সমস্য সামাধান করা যাবে ।

নিরাপদ সড়ক সরকার ও জনগন :- সড়ক নিরাপদ রাখার জন্য সরকার  বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে ।
সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধের এবং যানবাহনের নিয়মর জন্য ১৯৮৮ সালে রোড ট্রান্সপোট অথরিটি (BRTA) গঠন করা হয় ।এর আগে ১৯৬১ সালের জারিকৃত এক অধ্যাদেশর মাধ্যমে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন ( BRTC ) গঠিত হয় ।এছাড়াও গঠন করা হয় ঢাকা যানবাহন সমন্ধয় বোর্ড (DTCB ) গঠিত হয় ।বাংলাদেশ

প্রকৌশলি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট ) এ দুর্ঘটনা রির্সাচ সেন্টার স্হাপন করা হয় । ২০০৫ সালে দেশের হাইউয়ে সড়ক গুলোতে হাইউয়ে পুলিশ মোতায়ন করা হয় । এছাড়া বেসরকারী ভাবেও বিভিন্ন সংগঠন রয়েছে  বাংলাদেশ যাএী কল্যান সমিতি , নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন ( নিচা ) ইত্যাদি ।

নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন :- নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের গোড়াপওন হয় ১৯৯০ সালের দিকে । সর্বপ্রথম  চিএনায়ক ইলিয়াস কাজ্ঞন নিরাপদ সড়ক চাই চাই আন্দোলনের শুরু করেন । এতদিন যাব এই আন্দোলন বেগবান হয় নাই । তবে  ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই ঢাকাই দুইজন কলেজ শিক্ষার্থী বেপরোয়া গাড়ী চালকের কারণে  মৃত্যু হওয়ায় তাদের সহপাঠিরা কার্যকর নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন ।এবং এই আন্দোলনে  সকল শ্রেণীর মানুষের সমর্থন ছিল । একটা সময় এসে সারা দেশে এই আন্দোলন বেগবান হয়ে ২৯ জুলাই থেকে ৮ আগষ্ট পর্যন্ত চলতে থাকে । পরিশেষে সরকার আন্দোলনের দাবী মেনে নিতে বাধ্য হয় ।

নিরাপদ সড়ক আইন :- ২০১৮ সালে মন্ত্রীসভায় নিরাপদ সড়ক আইন ২০১৮ খসড়া অনুমাদন করেন । এই আইনে বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে দুর্ঘটনার মাধ্যমে গুরুতর আহত বা প্রাণহানি ঘটালে চালকের সর্বউচ্চ ৫ বছরের কারাদন্ড ও অর্থদন্ডের বিধান রয়েছে । তবে যদি এই ধরণের মৃত্যু ইচ্ছাকৃত প্রমানিত হলে দন্ডবিধির ৩০২ ধারা অনুসারে তার বিচার হবে এবং সর্বউচ্চ মৃত্যুদন্ড হবে ।এছাড়াও নির্ধারিত গতিসীমার , অতিরিক্ত গতি বা বেপরোয়াভাবে ঝাঁকিপূর্ণ ভাবে ওভারটেকিং বা ওভারলোডিং বা নিয়ন্তণহীনভাবে  গাড়ী চলানোর মাধ্যমে দুর্ঘটনা করে জীবন বা সম্পত্তির ক্ষতি করলে অনধিক তিন বছর কারাদন্ড বা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবে ।

উপসংহার :- প্রতি প্রাণীকে মৃত্যুর সাধ গ্রহন করতে হবে । তার মানে এই নয় যে কেউ নিশ্চয়ই বলি হয়ে বা স্বাভাবিকভাবে মরতে চাই । সড়ক দুর্ঘটনা কথা শুনলেই আমাদের মনে কম্পনের সৃষ্টি হয় । অজানা একাটা ভয় আমাদের মনেকে ঘিরে ধরে । এই সড়ক দুর্ঘটনা বেড়ে যাচ্ছে প্রতিদিন । আজ বাংলাদেশ প্রতিটি মানুষের একটাই দাবী স্বাভাবিক মৃত্যুর নিচ্ছয়তা চাই এবং নিরাপদ সড়ক চাই ।

Please comment Here (ভাল লাগলে কমেন্ট করুন)