সত্য প্রকাশঃ বিমানে পেঁয়াজ আসলেই কি দাম কমবে পেঁয়াজের? ভারত কি সত্যিই হঠাত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করেছে?

0
348

ফেসবুক, ইউটিউব, টেলিভিশনসহ সকল সোসাল মিডিয়ায় এখন পেঁয়াজের ছড়াছড়ি। শুধু বাংলাদেশে নয় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষও এখন বাংলাদেশের পেঁয়াজের খবর জানে। কেননা, বাংলাদেশে পেঁয়াজের এই দাম বৃদ্ধি পৃথিবীর সকল দেশকে হার মানিয়েছে। রচনা করেছে নতুন ইতিহাস। কয়েকদিন আগেই একটি পত্রিকায় সংবাদ হয়েছে পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধিতে বিশ্ব রেকর্ড করেছে বাংলাদেশ। গত এক বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যটির দাম বেড়েছে গড়ে সাড়ে ১১ শতাংশ। আর এক মাসে বেড়েছে সাড়ে ৫ শতাংশের মতো। তবে বাংলাদেশে বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে অনেক বেশি হারে বাড়ছে পণ্যটির দাম। যা বিশ্বে সর্বোচ্চ।

গত এক বছরে ৩৫২ ও এক মাসে ৬৪ শতাংশ বেড়ে দেশে পাইকারিতেই প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১৭০ টাকায় (২ ডলার), যা বিশ্বে অন্যতম সর্বোচ্চ। এই রেকর্ডটা তখনকার, যখন মূল্য ১৭০ টাকা ছিল, আর এখন পেঁয়াজের দাম ২৫০ পেরিয়ে ৩০০-এর দিকে রওনা হয়েছে। বলাই যায়, এমন এক বিশ্বরেকর্ড বাংলাদেশ গড়তে যাচ্ছে যেটা কোনোদিন অন্য কোনো দেশ হয়তো আর ভাঙতে পারবে না।

খবর পাওয়া গেল দু-একদিনের মধ্যে কার্গো বিমানে চড়ে মহামূল্যবান পেঁয়াজ বাংলাদেশে পৌঁছবে। এ খবরের এক ধরনের স্টান্ট আছে হয়তো, কিন্তু সংকট সমাধানে এর আদৌ প্রভাব রাখতে পারার কোনো কারণ নেই। দেশে প্রতিদিনের পেঁয়াজের চাহিদা সাত হাজার টনের মতো।

খুব বড় একটা কার্গো বিমানে ৭০ থেকে ১০০ টনের মতো পণ্য বহন করা যায়। মানে বাংলাদেশের একদিনের চাহিদা পূরণ করার জন্য ১০০টির মতো কার্গো বিমান লাগবে প্রতিদিন। তাই খুব সহজেই অনুমেয় এই পেঁয়াজ বাজারে আদৌ কোনো প্রভাব রাখতে পারবে না।

আমরা এর মধ্যেই জেনে গেছি, এ সংকট প্রচণ্ড আকার ধারণ করেছে মূলত ভারতের পেঁয়াজ রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়ার পর থেকে। ক্ষমতাসীনরা এই বিষয়টিকে সামনে দেখিয়ে আমাদের কাছে মুখ রক্ষার চেষ্টা করছেন। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সবাই বলার চেষ্টা করছেন ভারত হঠাৎ করে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয়ায় এই বিপদে পড়েছে বাংলাদেশ। ভারত কি আসলে হঠাৎ করে রপ্তানি বন্ধ করেছিল? আসলে এগুলো নিছক অযুহাত। ভারতের যে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ হবে তা ভারতের বিভিন্ন পত্রিকায় অনেক আগে থেকেই ইংগিত দিচ্ছিলো। কিন্তু আমাদের দায়িত্বহীন সরকারী লোকজন এগুলোর কোনো খোজখবরই রাখেন না। তারা দায়িত্বহীন। যত দায় জনগণের…

ব্যাপারটা বুঝে নেয়া খুবই সহজ। আমিও এখন যে কথাগুলো বলব সেগুলোর সত্য-মিথ্যাও যে কেউ ইন্টারনেটে গিয়ে দেখে নিতে পারেন। আমি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলতে চাই, ভারতের রফতানি বন্ধ মোটেও হঠাৎ সিদ্ধান্ত ছিল না। ভারতের রফতানি বন্ধ হয়ে যেতে পারে পুরোপুরি সেটা বোঝা যাচ্ছিল কয়েক মাস আগে থেকেই।

ভারতের সবচেয়ে বেশি পেঁয়াজ উৎপাদনকারী রাজ্য মহারাষ্ট্র বন্যা ও অতিবৃষ্টিতে আক্রান্ত হয়েছিল। এতে পেঁয়াজের উৎপাদন ৩০ শতাংশ কমে যেতে পারে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিল।

এরপর পেঁয়াজের দাম ভারতেই যখন বাড়তে শুরু করে, তখন মহারাষ্ট্র এবং হরিয়ানার বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে পেঁয়াজের দাম নিয়ন্ত্রণের সব ধরনের পদক্ষেপ নেয়া শুরু হয়।

এখানে উল্লেখ্য, নির্বাচনে পেঁয়াজের মূল্য খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এসব এলাকার অতিদরিদ্র মানুষ শুধু পেঁয়াজ দিয়ে রুটি খায়। তাই প্রয়োজনে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দিয়ে পেঁয়াজের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা হবে এমন আলোচনা ভারতের পত্র-পত্রিকায় ছিল।

আগস্টের মাঝামাঝি ভারতের পত্রিকায় খবর হয়েছিল পেঁয়াজের দাম গত এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, আর সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে পেঁয়াজের দাম চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে গেছে- এমন খবর প্রকাশিত হয়েছিল। এরপর ১৩ সেপ্টেম্বর প্রতি টন পেঁয়াজের রফতানি মূল্য ৮৫০ ডলারে বেঁধে দেয় ভারত সরকার।

এর কিছুদিন পর, ২৯ সেপ্টেম্বর ভারত পেঁয়াজ রফতানি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। এ ঘটনাগুলো একটার পর একটা সাজালে যে কেউ খুব সহজেই বুঝতে পারবেন, ভারত পেঁয়াজের রফতানি হঠাৎ করে বন্ধ করেনি।

এমনটা কেন হল তার জবাবে দুটো সম্ভাবনার কথা তাত্ত্বিকভাবে বলা যায়। একটা হচ্ছে, এটা সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ভীষণরকম অদক্ষতা, অযোগ্যতা। তারা এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ পূর্বাভাস সত্ত্বেও সঠিক পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে।

আরেকটা হতে পারে জেনেশুনে, একেবারে পরিকল্পনা করে এই কাজটি করা হয়েছে। যৌক্তিক কারণেই আমার কাছে দ্বিতীয় সম্ভাবনাটিকেই সঠিক বলে মনে হয়। একটা পরিসংখ্যানই এটার পক্ষে খুব শক্ত যুক্তি হিসেবে দাঁড়াতে পারে।

কনসাস কনজ্যুমার্স সোসাইটি (সিসিএস) নামের একটি সংগঠন গত ২ নভেম্বর হিসাব করে দেখিয়েছে গত চার মাসে পেঁয়াজ নিয়ে কারসাজি করে, কম দামে আমদানি করা পেঁয়াজ অনেক বেশি দামে বিক্রি করে জনগণের পকেট থেকে ৩১৭৯ কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে।

এ হিসাব করা হয়েছিল যখন পেঁয়াজের দাম ১৫০ টাকার আশপাশে। আর এখন পেঁয়াজ ট্রিপল সেঞ্চুরির কাছাকাছি। বেশ কয়েকদিন আগেই খবর এসেছিল মিয়ানমার থেকে আমদানি করা ৪২ টাকার পেঁয়াজ বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৩০ টাকায়।

সম্প্রতি এ খবরও আমরা পেলাম, কয়েকদিন আগে শ্যামবাজার আড়ত থেকে ১৩৭ টাকা কেজি দরে কেনা পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ২২০ টাকায়, অর্থাৎ প্রতি কেজিতে লাভ ৮৩ টাকা। এসব বিবেচনায় নিলে ২ নভেম্বর লুটপাটের যে অঙ্কটা দেখা গিয়েছিল, সেই অঙ্কটা এখন কত হয়েছে সেটি সহজেই অনুমেয়।

যথেষ্ট পরিমাণ পূর্বাভাস ছিল কিন্তু সময় থাকতে বিকল্প কোনো দেশ থেকে আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি, আর এখন যে অকল্পনীয় পরিমাণ লাভ পেঁয়াজকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা হচ্ছে এ দুটো বিষয়কে একসঙ্গে মেলালে এটা দৃঢ়ভাবেই বলা যায়, পেঁয়াজ নিয়ে এ ঘটনা পরিকল্পনা করেই ঘটানো হয়েছে।

দুর্নীতির যে ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দানব তৈরি করা হয়েছে দিনের পর দিন, যার খাবার জোগান দিতে হয়েছে মেগা প্রকল্পসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, শেয়ারবাজার, ব্যাংক, এমনকি জনগণের সরকারি দৈনন্দিন সেবা পাওয়ার ক্ষেত্র থেকে, তাকে ক্রমাগত নতুন খাবারের সংস্থান করে যেতেই হবে।

এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে জনগণের অত্যাবশ্যক ভোগ্যপণ্যের কারসাজি করা। হ্যাঁ, পেঁয়াজ দিয়ে ঠিক এরকম একটা কারসাজি হচ্ছে। এটা দুর্নীতির সে ফ আরেকটা ক্ষেত্র।

পেঁয়াজের ডামাডোলের মধ্যে এই লুটপাটের আরেক আলামত শুরু হয়েছে। পত্রিকায় খবর এসেছে গত কয়েক দিনে সব ধরনের চালের প্রতি কেজিতে ৬ থেকে ৭ টাকা দাম বেড়েছে।

যৌক্তিক অনুমান করাই যায়, চালের দাম নিয়ে এবার ‘খেলা’ হবে এবং সেটার মাধ্যমে আরও অনেক বেশি অঙ্কের টাকা মানুষের পকেট থেকে নিয়ে যাওয়া হবে। প্রশ্ন হচ্ছে বর্তমান বাংলাদেশেই কেন একের পর এক এমন ঘটনা ঘটতেই থাকে?

দিল্লিতে অন্তত দু’বার সরকার পতনের পেছনে পেঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধি খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। ১৯৯৮ সালে সুষমা স্বরাজ যখন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন তখন পেঁয়াজের দাম ৫০ রুপিতে পৌঁছেছিল, যেটা সে সময়ের মধ্যে অত্যন্ত উচ্চ মূল্য। তার কিছুদিন পরে নির্বাচনে বিজেপি পরাজিত হয় এবং কংগ্রেস জেতে ও শীলা দীক্ষিত দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী হন।

বলা বাহুল্য, সেই নির্বাচনে খুব গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছিল পেঁয়াজের দাম। মজার ব্যাপার, ২০১৩ সালে শীলা দীক্ষিতের পতনের সঙ্গেও পেঁয়াজের উচ্চমূল্য জড়িত। সেই বছর পেঁয়াজের মূল্য সে সময়ের সর্বোচ্চ, ৮০ রুপিতে পৌঁছেছিল। তার দল কংগ্রেস পরাজিত হয়ে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টি জেতার পেছনে পেঁয়াজের উচ্চমূল্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

এভাবেই পেঁয়াজের উচ্চমূল্য ভারতের রাজনীতিতে একটা বোমার মতো কাজ করে। এই বোমাকে ভয় পায় সব রাজনৈতিক দলই, তাই তারা সর্বতোভাবে চেষ্টা করে এই বোমা যেন বিস্ফোরিত না হয়। ভারতের সেই রাজনীতিতে পেঁয়াজ যদি হয়ে থাকে ‘কনভেনশনাল ওয়েপন’, বাংলাদেশে এখন পেঁয়াজ হওয়ার কথা এটম বোমা, যেটা বিস্ফোরিত হয়ে গেছে। কিন্তু সরকার বেশ নিশ্চিন্তে আছে।

পেঁয়াজের মূল্য কমানো দূরেই থাকুক, পেঁয়াজ খাওয়া ছেড়ে দেয়া জাতীয় পরামর্শ এখন আমরা শুনতে পাচ্ছি। আসলে আজ এই দেশে পেঁয়াজ বোমা হওয়া দূরেই থাকুক, পটকাও নয়। পেঁয়াজ বা অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বৃদ্ধি সরকারকে আদৌ বিচলিত করে না।

একটা সরকার এসব বিষয়ে তখনই বিচলিত হয় যখন সেই সরকার নির্বাচনের জন্য জনগণের সামনে গিয়ে ভোট প্রার্থনা করে। দিল্লির উদাহরণে এটা আমাদের কাছে খুব স্পষ্ট হয়েছে।

শুধু পেঁয়াজই নয়, অত্যাবশ্যক পণ্যগুলো যেদিন আমাদের দেশে একেকটা বোমা হয়ে উঠবে, যে বোমাকে ভয় পাবে প্রতিটি ক্ষমতাসীন সরকার এবং তারা জানবে এটা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে আগামী নির্বাচনে তাদের জন্য মহাবিপদ অপেক্ষা করছে, ততদিন পর্যন্ত এসব লুটপাট চলবেই।

পাদটীকা : সরকার দাবি করে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক এখন স্মরণকালের সর্বোচ্চ বন্ধুত্বপূর্ণ পর্যায়ে আছে। বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী তো বলেই ফেলেছেন বাংলাদেশ ভারতের সম্পর্ক ‘স্বামী-স্ত্রীর মতো’। কিন্তু আমরা অবাক হয়ে দেখি বাংলাদেশ এই চরম সংকটের সময় তার বন্ধু বা ‘স্পাউস’ ভারতের কাছ থেকে পেঁয়াজ পায়নি, যদিও পাচ্ছে মালদ্বীপ।

মালদ্বীপে পেঁয়াজ রফতানির সিদ্ধান্ত বহাল থাকার বিষয়ে মালদ্বীপের ভারতীয় মিশন টুইট করে বলেছে, ‘আমরা আমাদের বন্ধু মালদ্বীপকে আশ্বস্ত করতে চাই যে, টানা দাম বৃদ্ধি ও দেশে এক লাখ টন পেঁয়াজের ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও মালদ্বীপে পেঁয়াজ রফতানি করতে চায় ভারত।’

রোহিঙ্গা সংকট থেকে শুরু করে নানা ক্ষেত্রে একের পর এক চরম কূটনৈতিক ব্যর্থতার পরিচয় দেয়া সরকারের ব্যর্থতার পাল্লা ভারী করবে ভারত থেকে পেঁয়াজ না পাওয়া, এটা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

সূত্রঃ যুগান্তর 

 

Please comment Here (ভাল লাগলে কমেন্ট করুন)