রচনা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনী

0
206
This entry is part 9 of 9 in the series বাংলা রচনা

রচনা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনী

ভূমিকাঃ হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলার ইতিহাসে এক স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব।  ঔপনিবেশিক শাসন শোষণ নিপীড়নের হাত থেকে বাঙালি জাতিকে রক্ষা করতে তিনি দীর্ঘকাল সংগ্রাম করেছেন । সংগ্রাম করতে গিয়ে তিনি বহুবার কারাবরণ করেছেন । বাঙালির অধিকার ও স্বতন্ত্র মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে।  এদেশের গণমানুষের মুক্তির জন্য পরিচালিত সকল আন্দোলনের তিনি ছিলেন প্রধান চালিকাশক্তি । তার নেতৃত্বেই ১৯৭১  সনে আমরা মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি এবং দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জন করেছি স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ। তিনি বজ্রকন্ঠের অধিকারী তিনিই সৃষ্টি সুখের উল্লাসে কাঁপা মহান পুরুষ শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বাঙালি জাতির জন্য তিনি বঙ্গবন্ধু উপাধি ও জাতির জনকের মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়েছে। 

বঙ্গবন্ধুর জীবনীঃ ১৯২০, ১৭ ই মার্চ গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গীপাড়া গ্রামে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জন্মগ্রহণ করেন । ১৯২৭ সালে সাত বছর বয়সে গিমাডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে জাতির জনকের প্রাতিষ্ঠানিক ছাত্রজীবনের সূচনা হয় । ১৯২৯ সালে বঙ্গবন্ধুকে গোপালগঞ্জ সীতানাথ একাডেমির তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র হিসেবে ভর্তি করা হয়।  ১৯৩৭  সালে অসুস্থতার কারণে বঙ্গবন্ধুর লেখাপড়া বন্ধ ছিল, পরে আবার তা শুরু হয় । ১৯৩৯ সালে তার উদারতার জন্য প্রথম কারাবরণ করেন । ১৯৩৮ সালে মাত্র ১৮  বছরে বিবাহ করেন। বঙ্গবন্ধু ১৯৪২ সালে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন । ১৯৪৪ সালে মুসলিম ছাত্রলীগের সম্মেলনে যোগদান করে, সেখান থেকে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়।  ১৯৫২ সালের ১৪ ই ফেব্রুয়ারি বাংলা রাষ্ট্রভাষার দাবিতে জোরালো ছিলেন, ১৯৫৪  সালের সাধারণ নির্বাচনে ২৩৭ টি আসনের মধ্যে ২২৩ টি আসনে বিজয়ী হন ১৯৫৪ সালে বঙ্গবন্ধু যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভায় কনিষ্ঠ মন্ত্রী হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন।  তারপর থেকে বাঙ্গালীদের জন্য অসহ আন্দোলন করতে থাকেন।  বাঙ্গালীদের মুক্তির জন্য ১৯৭১ সালের ৭ ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ দেন এবং বাঙ্গালীদের পাকিস্তানের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে বলে বাঙালিরা  তার ডাকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং দীর্ঘ নয় মাস মুক্তিযুদ্ধ হয় বাঙালিরা জয়লাভ করে কিন্তু তারপরেও ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা বিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের ষড়যন্ত্রের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু সপরিবারে শহীদ হয়। 

নেতৃত্বঃ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছাত্রজীবনেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন।  অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র থাকাকালীন অন্যায়ের প্রতিবাদ করার জন্য তিনি জেলে যান।  ছাত্রজীবনে তিনি শেরে বাংলা এ কে এম ফজলুল হক , মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী,  হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং সুভাষচন্দ্র বসুর সান্নিধ্য লাভ করেন ও রাজনীতি সংলগ্ন হয়ে ওঠেন।  মাতৃভাষা বাংলার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের নিয়ে গঠিত হয় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ।  তৎকালীন ছাত্র ও তরুণের প্রচেষ্টায় এ পরিষদ গঠিত হয়, তাদের মধ্যে বিশিষ্ট ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।  ১৯৪৮ সালের ১১ ই মার্চ ভাষার দাবিতে ধর্মঘট ডাকা হলে শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, কাজী গোলাম মাহবুব সহ আরো অনেকে ছাত্রনেতা গ্রেফতার হন।  দীর্ঘকাল বঙ্গবন্ধু বাঙালির অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করেন।  ফলে বারবার তাকে জেল খাটতে হয়। ১৯৬৬ সালের ৫ ই  ফেব্রুয়ারি লাহোরের বিরোধী দলের এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয। বঙ্গবন্ধু পূর্ব পাকিস্তানের সব ধরনের অধিকার ফিরে পাওয়ার জন্য ছয় দফা কর্মসূচি উত্থাপন করেন।  6 দফা আন্দোলনকে দমন করার জন্য পাকিস্তানি শাসকেরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য নেতার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে এই ঐতিহাসিক আগরতলা মামলায় পাকিস্তানি শাসকদের উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও সংশ্লিষ্ট নেতৃত্বকে গোপন বিচার করে ফাঁসি দেওয়া । যাতে নেতৃত্ব শূন্য করে আন্দোলন থামিয়ে দেওয়া যায়।  এটাই ছিল তাদের মূল  লক্ষ্য । ১৯৬৯  সালের জানুয়ারি থেকে শুরু করে ২৫ শে মার্চ পর্যন্ত সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানের জোয়ারে আইয়ুব খানের স্বৈরশাসন টিকে থাকতে পারেনি। ২২ শে ফেব্রুয়ারি আইয়ুব খান আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করে সব রাজনৈতিক বন্দিকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হয় । কারামুক্ত শেখ মুজিবকে  ২৩ শে ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানের বিশাল গণসংবর্ধনা দেওয়া হয়।  ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের শতকরা ৮০ ভাগ আসনে বিজয়ী হন।  কিন্তু আওয়ামী লীগকে সরকার গঠন করতে দেওয়া হয়নি ২৫ শে মার্চ রাতে পাকিস্তানিরা নিরস্ত্র বাঙালির ওপর নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালায় গ্রেফতার হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আর গ্রেফতার হওয়ার আগেই বঙ্গবন্ধু 26 শে মার্চ প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ ।  নয় মাস যুদ্ধের পর ৩০ লক্ষ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে ১৬ ই ডিসেম্বর অর্জিত হয় বাঙালির বিজয় । শুধু বাঙালি জাতি নয় বাংলা ভাষার মর্যাদাও  বিশ্বের কাছে প্রতিষ্ঠিত হয় ।

রাজনৈতিক জীবনঃ  ছাত্রজীবনে তিনি রাজনৈতিক জীবনে জড়িয়ে পড়েন তিনি 1952 সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে সকল আন্দোলনে যোগদান করেন .১৯৫৪, ১৯৫৬ তিনি পূর্ব পাকিস্তানের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন পরে তিনি 1958 সালে আওয়ামী লীগ নামে একটি দল গঠন করেন ১৯৬৬ সালের ৬ দফা পেশ করেন । বিশ্ব রাজনীতির  অবিসংবাদিত কিংবদন্তি বাংলা ও বাঙালি জাতির জনক রাজনৈতিক জীবন শুরু করার আগেই গ্রামের হতদরিদ্র মানুষের দুঃখ নিজের মনে করতেন অন্যায় বা অন্যায় কারী যত শক্তিশালী হোক না কেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার প্রতিবাদ করতে বিন্দু পরিমান বিচলিত হতেন না ।

মানুষের প্রতি ভালোবাসাঃ  দিনে দিনে বড় হওয়া বঙ্গবন্ধু পায়ে হেঁটে স্কুলে যায় দুচোখে মেরে দেখে বাংলার মাঠ ঘাট পথ-প্রান্তর সোনালী ধানের খেত গায়ের অনেক ছেলের সঙ্গে তার যোগাযোগ নিবিড় হয় । প্রায়ই সে বন্ধুদের বাড়ি নিয়ে আসে বলে মা ওদের খেতে দাও।  মা হাসিমুখে ছেলের আবদার পূরণ করে বর্ষাকালে স্কুলে যেতে বাবা বঙ্গবন্ধুকে ছাতা কিনে দিলেন । একদিন ছাতা ছাড়া ভিজে ভিজে বাড়ি ফিরল খোকা মাকে জিজ্ঞাসা করলেন বাবা এমন  ভিজেছিস কেন?  খোকা হাসিমুখে বললেন মাগো আমার এক গরীব বন্ধুর ছাতা নেই আমার ছাতাটা ওকে দিয়ে দিয়েছি বঙ্গবন্ধু মানুষের প্রতি ভালোবাসা গভীর।  বঙ্গবন্ধু অন্যের দুঃখকে নিজের দুঃখ মনে করতেন ।

জাতি গঠনের অন্যতম অবদান সমূহঃ  স্বাধীনতা প্রাপ্ত যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।  জাতির পিতা অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখেও   এক লক্ষ ৬৫ হাজার প্রাথমিক শিক্ষক এর চাকরি সরকারি করেন।  প্রাথমিক শিক্ষক এর চাল-ডাল সহ পূর্ণাঙ্গ রেশন ব্যবস্থা চালু করেন পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত বিনামূল্যে বই খাতা ও পোশাক প্রদানের ব্যবস্থা করেন । এমনকি চৌচল্লিশ হাজার শিক্ষককে নিয়োগ ১১০০০ নতুন বিদ্যালয় সরকারি করেন । তারপর তিনি ১৯৭৩  সালে বিশ্ববিদ্যালয়কে পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসন প্রদান করেন মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন করেন হকারদের পুনর্বাসনের জন্য হকার্স মার্কেট গড়ে তোলেন । ২৫ বিঘা জমির খাজনা মওকুফ এবং ১০০ বিঘা জমির সিলিং ধার্য করেন।  ক্ষতিগ্রস্ত বিধ্বস্ত কল-কারখানা রাস্তাঘাট নির্মাণ ও মেরামত করেন । তিনি শিক্ষামূলক বিভিন্ন একাডেমিক প্রতিষ্ঠা করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিল্পকলা একাডেমী, শিশু একাডেমী ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করেন।

 বাংলাদেশের নামকরণঃ  পাকিস্তান দুটি অংশে বিভক্ত ছিল একটি পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তান।  পশ্চিম পাকিস্তানিরা সব সময় পূর্ব বাংলার জনগণের উপর অত্যাচার করত।  পূর্ববাংলার জনগণ পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধুর ডাকে আন্দোলন করে ।  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ভাষণে বাংলার জনগণকে  প্রতিবাদী হতে বলেছেন । পূর্ব বাংলাকে বাংলাদেশ নামে নামকরণ করেন ।

স্বদেশ প্রত্যাবর্তনঃ 26 শে মার্চ প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে । পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি দেশে আসেন । এই দিনটিকে বলা হয় বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন।

ইতিহাসের জঘন্য হত্যাকান্ডঃ ১৫ ই আগস্ট সেই ভয়াল কালোরাত পবিত্র শুক্রবার রাতের নিস্তব্ধ নীরবতা ভঙ্গ করে মসজিদে মসজিদে ফজরের আজান হচ্ছে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্ত বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিপথগামী একদল বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির 32 নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়িতে এক কুখ্যাত হামলা চালিয়ে ইতিহাসের জঘন্য হত্যাকাণ্ড ঘটায় । সেই দিন জননেত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ব্যতীত নিকটাত্মীয়সহ সপরিবারে শহীদ হয়। 

উপসংহারঃ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত বঙ্গবন্ধু স্মৃতি স্বার্থহীন আমাদের অঙ্গীকার হচ্ছে__

 সোনার বাংলা গড়বো পিতা, 

কথা দিলাম তোমায় ।

চেতনা থেকে বিচ্যুত হবো না,

গ্রেনেড তথা বোমায়। 

Series Navigation<< অধ্যবসায় রচনা pdf

Please comment Here (ভাল লাগলে কমেন্ট করুন)