“রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম” বাদ: আদৌ সম্ভব?

0
155

গত ১৬ আগস্ট বাংলাদেশের সংবিধান থেকে “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম” বাদ দিয়ে “ধর্মনিরপেক্ষতা” লেখার দাবিতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, আইন মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, বিএনপি মহাসচিব, জাতীয় পার্টির মহাসচিব, গণফোরামের ড. কামাল হোসেন, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) হাসানুল হক ইনু, ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেননকে বিবাদী করে লিগ্যাল নোটিশ প্রদান করেন বাংলাদেশ মাইনোরিটি সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি অশোক কুমার সাহা। দাবি জানানো হয়, লিগ্যাল নোটিশটি পাওয়ার দিন থেকে ১৫ দিনের মধ্যে “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম” সংবিধান থেকে বাদ দিয়ে “ধর্মনিরপেক্ষতা” লেখা শুরু করতে হবে। অন্যথায় বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক জনগণের পক্ষে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করা হবে।

প্রথমেই প্রশ্ন হোল, ইচ্ছেমত কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়ে দিয়ে “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম”কে সংবিধান থেকে বাদ দিয়ে “ধর্মনিরপেক্ষতা” লেখা শুরু করা কি সম্ভব? মানে, একটা নোটিশ এর মাধ্যমে কি সংবিধান বা তাঁর যে কোন অংশ “সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন, রহিতকরণ কিংবা অন্য কোন পন্থায় সংশোধন” করতে পারা যায়? আইন কি তা বলে? মোটেও না। তাহলে এই অর্বাচীনের মত কর্মকাণ্ডের অর্থ কি?

দ্বিতীয় প্রশ্ন হোল, প্রেরিত লিগ্যাল নোটিশ অনুযায়ী সংবিধান পরিবর্তন না করা হলে, বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক জনগণের পক্ষে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করার ইচ্ছে প্রকাশ করা হয়েছে। তাহলে বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, ১০২(২)(ক)(অ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নোটিশ প্রদানকারিকে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আর তার জন্য আইনি নোটিশ পাঠানোর কোন প্রয়োজন পড়ে না, সরাসরি হাইকোর্ট বিভাগে মামলা করতে হয়। তো, তা-ই যদি করতে হয় তবে আগে মামলা না করে, ঢাকঢোল পিটিয়ে লিগাল নোটিশ পাঠানোর মানে কি? অনেকটা বাদর নাচ শুরু করার আগে ডুগডুগি বাজানোর মতো হাস্যকর ব্যাপার নয় কি?

 

আর এদিকে এই নোটিশের বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়া মাত্রই দেশজুড়ে তর্ক-বিতর্কের ঝড় শুরু হয়ে গেল। করোনা ক্রান্তি লগ্নে কড়া বাদ-বিবাদে মুখর হয়ে উঠলো গণমাধ্যম থেকে সোশ্যাল মিডিয়া। রাজপথে বাংলাদেশের কট্টর ইসলামপন্থী জনগণ শুরু করে দিল প্রতিবাদ কর্মসূচি। মিছিলে মিছিলে শ্লোগান তোলা হোল, “রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম, বহাল চাই, বহাল চাই” অথবা “রক্ত দিয়ে লিখবো নাম, রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম”। তো এই ডামাডোলে নোটিশ দেয়ার মাত্র দু’দিন পরই গত ১৯ আগস্ট তারিখে বাংলাদেশের সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতার দাবি জানিয়ে পাঠানো আইনি নোটিশটি প্রত্যাহার করে নেয়া হোল।

কি কারণে নোটিশটি প্রত্যাহার করা হয়েছে জানতে চাইলে নোটিশকারি বাংলাদেশ মাইনোরিটি সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি অশোক কুমার সাহা জানালেন, নোটিশ দেওয়ার পর বিশিষ্ট লেখক, সাংবাদিক ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাসগুপ্ত, গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, সামাজিক সংগঠন থেকে আমাদের সাথে যোগাযোগ করেছেন। তিনি আরও জানান, অনেকের কাছ থেকে আমরা আশ্বাসও পেয়েছি। তারা বলেছেন, রাজনৈতিকভাবেই বিষয়টি নিয়ে একটি সমঝোতায় আসা সম্ভব। এক্ষেত্রে আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগেই বিষয়টি সমাধান হবে বলেও অনেকে জানিয়েছেন। সেই কারণে নোটিশ প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

আমি আমার এই লেখায় মোটেও এই আলোচনা করতে চাই না যে বাংলাদেশের সংবিধানে “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম” থাকা উচিত কিত উচিত না। এই তাত্ত্বিক আলোচনা আমি অন্য জায়গায় এবং লেখনীতে বহুবার করেছি। আমি মনে করি, সংবিধান থেকে এই মুহূর্তে “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম” বাদ দেয়ার ব্যাপারে প্রাসঙ্গিক বিষয় মাত্র তিনটি:

এক, রাজনৈতিক সমঝোতায় সংবিধান থেকে “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম” কি বাদ দেয়া সম্ভব?

দুই, আদালত কর্তৃক সংবিধান থেকে “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম” কি বাদ দেয়া সম্ভব?

তিন, জাতীয় সংসদ কর্তৃক সংবিধান সংশোধন করে সংবিধান থেকে “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম” কি বাদ দেয়া সম্ভব?

রাজনৈতিক সমঝোতায় সংবিধান থেকে “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম” কি বাদ দেয়া সম্ভব?

প্রথমেই আসি রাজনৈতিক সমঝোতায় সংবিধান থেকে “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম” বাদ দেয়ার বিষয়টিতে। প্রায়ই তর্ক তোলা হয়, কোন্ রাজনৈতিক দল ইসলামপন্থী আর কোন্ রাজনৈতিক দল ধর্মনিরপক্ষেতায় বা অসাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাসী। আমি মনে করি, এই তর্ক অবান্তর। বাংলাদেশের যে কোন রাজনৈতিক দল, তা সে ধর্মনিরপেক্ষই হোক বা ধর্মভিত্তিক-ই হোক, নির্বিশেষে বাংলাদেশের সংবিধান মানতে বাধ্য।

যদি বাংলাদেশের সংবিধান নিজেই রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ দিতে অক্ষম হয়, তবে আর রাজনৈতিক দলগুলোর আদর্শিক ও দার্শনিক অবস্থান নিয়ে সমালোচনা করার জায়গাটি কোথায়? এই সমালোচনায় সাত মণ ঘিও পুড়বে না, রাধাও নাচবে না! সংবিধানে যা বলা আছে, তা-ই প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে মেনে চলতে হবে, সেটা কারো ভাল লাগুক বা না লাগুক। তাহলে, বোঝা গেল, রাজনৈতিক সমঝোতায় সংবিধান থেকে “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম” বাদ দেয়ার বিষয়টি সংবিধান মেনেই করতে হবে।

তবে উল্লেখ্য যে, ১৯৮৮ সালে সামরিক শাসক এরশাদ ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করার পর তার প্রতিবাদ করেছিল আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং আশ্চর্যজনকভাবে, জামায়াতে ইসলামীও। বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, সংবিধানে “রাষ্ট্রধর্ম  ইসলাম” সংযোজন করার মানেই হল “ধর্মের নামে জাতিকে বিভক্ত করার চেষ্টা”। শেখ হাসিনা বলেছিলেন, “রাষ্ট্রধর্ম  ইসলাম” সংযোজন নিয়ে “সংবিধানের সংশোধনী জনগণ মানবে না”। জামায়াতে ইসলামী বিবৃতিতে বলেছিল, “সরকার তাহাদের গণবিরোধী কার্যকলাপ ঢাকা দেয়ার জন্য ইসলামের নাম ব্যবহার করছেন”। একই সাথে, ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করার প্রতিবাদে ১৯৮৮ সালের ১১ জুন দেশব্যাপী হরতাল পালন করেছিল রাজনৈতিক দলগুলো। কিন্তু আজকের বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। ‘সেই রামও নেই! সেই অযোধ্যাও নেই।’ সেই রাজনৈতিক সময়ও আর নেই! নেই সেই অসাম্প্রদায়িক চেতনা! তো রাজনৈতিক সমঝোতায় সংবিধান থেকে “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম” বাদ দেয়ার বিষয়টি আজকের বাস্তবতায় অনেকটা সোনার পাথরবাটি-ই বটে।

প্রতিনিয়ত আপডেট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ এ যুক্ত থাকুন।

আদালত কর্তৃক সংবিধান থেকে “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম” কি বাদ দেয়া সম্ভব?

এবার আসি আদালত কর্তৃক “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম” বাদ দেয়ার বিষয়ে। আমরা জানি, বাংলাদেশের সংবিধানের ২ক অনুচ্ছেদে “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম” সংযোজন করা হয়েছে। ২ক অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে,

                                                      “প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, তবে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ অন্যান্য ধর্ম পালনে রাষ্ট্র সমমর্যাদা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করিবেন।”

এখন বাংলাদেশের আদালতের মাধ্যমে যদি সংবিধান থেকে “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম” বাদ দিতে হয় তাহলে সংবিধানের ২ক অনুচ্ছেদকে আদালতের মাধ্যমে অসাংবিধানিক ঘোষণা করাতে হবে। ইতিপূর্বে ১৯৮৮ সালে সংবিধান থেকে “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম” বাদ দেয়ার জন্য সংবিধানের ২ক অনুচ্ছেদকে চ্যালেঞ্জ করে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাই কোর্ট বিভাগে মোট তিনটি রিট পিটিশন দায়ের করা হয়। এগুলো হোল, শক্তি দাস কর্তৃক দায়েরকৃত রিট পিটিশন নং ১১৭৭/১৯৮৮; নারী পক্ষ কর্তৃক দায়েরকৃত রিট পিটিশন নং ১৩৩০/১৯৮৮; এবং বাংলাদেশের ১৫ জন বিশিষ্ট নাগরিক কর্তৃক দায়েরকৃত রিট পিটিশন নং ১৮৩৪/১৯৮৮ (সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এবং অন্যান্য বনাম বাংলাদেশ)।

সংবিধানের ২ক অনুচ্ছেদকে চ্যালেঞ্জ করে এই সব রিট পিটিশন মামলার মধ্যে মাত্র একটি মামলার নিষ্পত্তি করা হয়েছে। তাও আবার দীর্ঘ ২৮ বছর পর। ২০১৬ সালের ২৮ মার্চ তারিখে বিচারপতি নাঈমা হায়দার, বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি মো. আশরাফুল কামালের সমন্বয়ে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের হাই কোর্ট বিভাগে গঠিত বিশেষ বেঞ্চ ১৫ জন বিশিষ্ট নাগরিক কর্তৃক দায়েরকৃত রিট পিটিশনটি খারিজ করে দেয়। আদালতের রায় অনুযায়ী, “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম” সংক্রান্ত রিটকারীদের আবেদনের ‘অধিকার’ (লোকাস স্টান্ডি) নেই বলে আদেশে উল্লেখ করেছেন আদালত। ফলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলাম বহাল থেকে যায়।

এখানে উল্লেখ্য যে, ২৮ বছর আগে (১৯৮৮ সালে) ১৫ বিশিষ্টজনের করা রিট আবেদনের ২৩ বছর পর (২০১১ সালে) রুল জারি করা হয়। আর রুল জারির প্রায় ৫ বছর পরে (২০১৬ সালে) রুল শুনানির দিন ধার্য  করা হয়। রুল শুনানির দিনই রিট আবেদনটি খারিজ করে দেয় আদালত। ১৫ জন বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দের মধ্যে ছিলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি কামালউদ্দিন হোসেন, কবি সুফিয়া কামাল, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, সাবেক বিচারপতি দেবেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য, সাবেক বিচারপতি কেএম সোবহান, অধ্যাপক খান সরওয়ার মুর্শিদ, আইনজীবী সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ, অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, কলিম শরাফী, অধ্যাপক মোশাররফ হোসেন, মেজর জেনারেল (অব.) সি আর দত্ত, বদরুদ্দীন উমর, সাংবাদিক ফয়েজ আহমদ, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর ও অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। যখন রিট পিটিশনটির রুল শুনানি হয় তখন উপরে উল্লিখিত আবেদনকারীদের মধ্যে প্রথম ১০ জনই মারা গেছেন। বেঁচে থাকা শেষ পাঁচজনের অন্যতম বদরুদ্দীন উমর রিট শুনানির ঠিক আগে আগে গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠিয়ে রিট থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়ার ঘোষণা দেন।

২০১৬ সালে “রাষ্ট্রধর্ম” নিয়ে রিট পিটিশনটি খারিজ করে দেয়া হলেও ২০০৫ সালে এম সালিম উল্লাহ বনাম বাংলাদেশ মামলাতে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাই কোর্ট বিভাগ তার পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছেন যে, বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম”কে পরিবর্তন করে “’সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস”কে প্রতিস্থাপন করার মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক স্তম্ভের ওপর আঘাত হানা হয়েছে। এই মামলাটিতে পরোক্ষভাবে হলেও “রাষ্ট্রধর্ম” বিষয়টিকে বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক স্তম্ভের পরিপন্থী হিসেবে আদালত চিহ্নিত করেছে।

তারপরও দেখা যাচ্ছে সংবিধান থেকে “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম” বাদ দেয়ার বিষয়টি নিয়ে আদালতের একটা অনীহা রয়েছে। মোট কথা “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম” নিয়ে যে সংবিধান সংশোধনীসমূহ আনা হয়েছে তা সংবিধান পরিপন্থী কিনা সে ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত নিতে আমাদের আদালত খুব একটা উৎসাহী নন। কারণটা কি? ২০০৫ সালে আদালত “ধর্ম-নিরপেক্ষতা”কে বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক স্তম্ভ হিসেবে চিহ্নিত করলেও “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম”-এর বিষয়ে ১৯৮৮ সালে দায়েরকৃত এবং ২০১১ সালে ইস্যু কৃত রুলের শুনানি করে নিষ্পত্তি করতে মোট ২৮ বছর নিয়ে নিল? এদিকে মনে রাখা দরকার, ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতেও কিন্তু “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম” বহাল রাখা হোল।

১৯৭৩ সালের ২৪ এপ্রিল ভারতের সুপ্রিম কোর্ট কেশবানন্দ ভারতী বনাম কেরালা সরকার মামলায় ঐতিহাসিক এক রায় দিয়েছিল, যা ভারতের বিচারবিভাগের ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে গণ্য। ১৩ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ ৭-৬ ভোটে রায় দিয়েছিল, সংবিধানের মূল কাঠামো পরিবর্তনযোগ্য নয় এবং সংসদ তা বদল করতে পারবে না। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট নেহরু-গান্ধী বনাম রাজ নারায়ণ (১৯৭৯), মিনার্ভা মিলস লিমিটেড বনাম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া (১৯৮০) এবং ওমান রাও বনাম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া (১৯৮০) মামলা সমূহে একই সিদ্ধান্তে উপনীত হন।

বাংলাদেশের আদালত ১৯৮৯ সালে আনোয়ার হোসেন বনাম বাংলাদেশ মামলাতে, যা অষ্টম সংশোধনী মামলা নামে পরিচিত, সংবিধানের মৌলিক কাঠামো বিষয়ে প্রথম রায় দেন। ২০০৫ সালে বাংলাদেশের আদালত “ধর্ম-নিরপেক্ষতা”কে বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক স্তম্ভ হিসেবে চিহ্নিতও করে। কিন্তু ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ৭খ অনুচ্ছেদ সংযোজন করা হলে সংবিধানের কোন বিধানগুলো তার মৌলিক কাঠামো হিসেবে গণ্য হবে তা উল্লেখ করা হয়। অনুচ্ছেদ ৭খ অনুসারে নিম্নলিখিত বিধানগুলোকে আমাদের সংবিধানের মৌলিক কাঠামো হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে:

(ক) সংবিধানের প্রস্তাবনা;

(খ) সংবিধানের প্রথম ভাগের সকল অনুচ্ছেদ (অনুচ্ছেদ ১-৭খ);

(গ) সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগের সকল অনুচ্ছেদ (অনুচ্ছেদ ৮-২৫);

(ঘ) সংবিধানের নবম-ক ভাগ (অনুচ্ছেদ ১৪১ক, অনুচ্ছেদ ১৪২খ ও
অনুচ্ছেদ ১৪২গ) সাপেক্ষে সংবিধানের তৃতীয় ভাগের সকল
অনুচ্ছেদ (অনুচ্ছেদ ২৬-৪৭ক);

(ঙ) সংবিধানের একাদশ ভাগের ১৫০ অনুচ্ছেদ (সংবিধানের ৪র্থ, ৫ম,
৬ষ্ঠ এবং ৭ম তফসিল)।

তাহলে, ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে কী? ২০১১ সালের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর পর থেকে “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম” যা নাকি আমাদের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২ক তে সন্নিবেশিত করা আছে, তা সংবিধানের প্রথম ভাগের অন্তর্গত হওয়ায় তাকে সংবিধানের ৭ক অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আমাদের সংবিধানের মৌলিক কাঠামো হিসেবে সুরক্ষিত করা হয়েছে। তাহলে, আদালত কোনভাবেই “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম” সংশ্লিষ্ট ২ক অনুচ্ছেদকে অসাংবিধানিক বলতে আর পারবে না। যতদিন আমাদের সংবিধানে অনুচ্ছেদ ৭ক জীবিত আছে, ততদিন আদালত “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম”কে বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক কাঠামো মানতে বাধ্য। অতএব, আদালতের মাধ্যমে “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম”কে বাংলাদেশের সংবিধান থেকে বাদ দেয়া সম্ভব না। আর তাই, এই বিষয়ে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করে কোনই লাভ হবে না।

জাতীয় সংসদ কর্তৃক সংবিধান সংশোধন করে সংবিধান থেকে “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম” কি বাদ দেয়া সম্ভব?   

উপরের আলোচনা থেকে আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে রাজনৈতিক সমঝোতা অথবা আদালতের মাধ্যমে “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম”কে বাংলাদেশের সংবিধান থেকে বাদ দেয়া সম্ভব না। তাহলে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ কি পারে “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম”কে বাংলাদেশের সংবিধান থেকে বাদ দিতে? মানে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ কি “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম” বিষয়ে কোন সাংবিধানিক সংশোধন কি আনতে পারে?

আমাদের সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী,

“(১) ‘জাতীয় সংসদ’ নামে বাংলাদেশের একটি সংসদ থাকিবে এবং এই সংবিধানের বিধানাবলী-সাপেক্ষে প্রজাতন্ত্রের আইন প্রণয়ন-ক্ষমতা সংসদের উপর ন্যস্ত হইবে…”

শুধু আইন প্রণয়ন-ই নয়, “জাতীয় সংসদ” সংবিধানের সংশোধনীও আনতে পারবে। সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী “জাতীয় সংসদ” বাংলাদেশের সংবিধানের বিধান সংশোধনের ক্ষমতাও রাখে। সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে:

“এই সংবিধানে যাহা বলা হইয়াছে, তাহা সত্ত্বেও- (ক) সংসদের আইন-দ্বারা এই সংবিধানের কোন বিধান সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন বা রহিতকরণের দ্বারা সংশোধিত হইতে পারিবে …”

তাহলে “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম” বিষয়ে কোন সাংবিধানিক সংশোধন কি আনতে পারা যাবে? এই প্রশ্নের সোজা-সাপটা উত্তর হোল, “না”। তার কারণ, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যে ৭খ অনুচ্ছেদ সংযোজন করা হয়েছে সেখানে সুস্পষ্ট ভাবে বলা হয়েছে

“সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, সংবিধানের … প্রথম ভাগের সকল অনুচ্ছেদ … সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন, রহিতকরণ কিংবা অন্য কোন পন্থায় সংশোধনের অযোগ্য হইবে।“

যেহেতু “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম” সংবিধানের প্রথম ভাগের অন্তর্গত, সেহেতু সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ এর মাধ্যমে জাতীয় সংসদ তার কোন সংশোধনী আনতে পারবে না। সংবিধানের ৭খ অনুচ্ছেদ তাঁকে মৌলিক কাঠামোর অংশ বানিয়ে ফেলেছে। আর শুধু তা-ই নয়, যদি কেউ “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম”কে বেআইনিভাবে পরিবর্তন করতে চায় তাহলে অনুচ্ছেদ ৭ক অনুসারে তিনি বা তারা শাস্তিযোগ্য হবেন। আর এর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, যতদিন বাংলাদেশের সংবিধানে ৭খ অনুচ্ছেদ বহাল থাকবে ততদিন সংবিধান থেকে “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম” বাদ দেয়া অসম্ভব। রাজনৈতিক সমঝোতায় তা সম্ভব নয়, আদালতও “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম”কে অসাংবিধানিক ঘোষণা করতে অক্ষম। এমন কি খোদ জাতীয় সংসদ চাইলেও “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম” বিষয়ে কোন সংশোধনী আনতে পারবে না। তাহলে আর “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম” বাদ দেয়া  নিয়ে অযথা মিটিং, মিছিল, শ্লোগান, তর্ক-বিতর্ক করে সময় নষ্ট করার কোন মানে হয় না। সংবিধানে ৭খ অনুচ্ছেদ বহাল রেখে “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম” বাদ দেয়ার দাবী তোলা আকাশ-কুসুম ভাবনা-ই বৈকি!

সূত্রঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন

ধন্যবাদ, itdoctor24.com এর সাথেই থাকুন।

পোস্টটি প্রয়োজনীয় হলে শেয়ার করুন।

Please comment Here (ভাল লাগলে কমেন্ট করুন)