সারাহাহ অ্যাপের প্রাইভেসি কি নিরাপদ?

0
761

টেকি দুনিয়ায় প্রতিমূহুর্তে সংযোজিত হচ্ছে নিত্যনতুন আবিষ্কার। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোও চেহারা পাল্টে ফেলছে প্রতিনিয়ত, আসছে নতুন মাধ্যম, প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে বেশীরভাগ আবার হারিয়েও যাচ্ছে। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মধ্যে সবশেষ হুজুগের হাওয়া এনে দিয়েছে মোবাইল অ্যাপ সারাহাহ, মোটামুটি বিশ্বের নানা প্রান্তের অনেক মানুষ, বিশেষত তরুণ সমাজ ডুব দিয়েছে এই অ্যাপে। বাংলাদেশেও এই ঝড়ের দমকা হাওয়া লেগেছে, ফেসবুকের নিউজফিড জুড়ে আছে সারাহাহ ব্যবহারকারীদের পোস্ট-কমেন্ট-শেয়ার।

সারাহাহ কী?

সারাহাহ মূলত একটি মেসেজিং অ্যাপ, আরবী এই শব্দটির অর্থ সততা, সরলরতা বা অকপটতা। এখানে নাম পরিচয় গোপন রেখে পরিচিত কাউকে নিজের খুশীমতো প্রশ্ন করা যায়। তবে যাকে প্রশ্ন করা হয়, তিনি অ্যাপে সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন না। সিস্টেমটা অনেকটা তিন-চার বছর আগে জনপ্রিয় হওয়া আস্ক.এফএম-এর মতো, তবে অনেকটা আধুনিক। সৌদী আরবের জায়ান আল আবিদিন তৌফিক নামের এক তরুণ ডেভেলপার তৈরী করেছেন এটি। শুরুতে সারাহাহ ছিল একটি ওয়েবসাইট, ব্যবহারকারী ছিল সর্বসাকুল্যে ৬০-৭০ জন। গত জুনের মাঝামাঝিতে চালু করা হয় অ্যাপ ভার্সন, এরপর থেকেই আরব দেশগুলোতে দারুণ জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে এটি, এখন তো ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া-আমেরিকার তরুণ সমাজের কাছেও চাহিদার শীর্ষে সারাহাহ অ্যাপ!

সারাহাহ কাজ করে যেভাবে

সারাহাহ মূলত তৈরী করা হয়েছিল সচেতন মন্তব্য বা সৎ প্রতিক্রিয়া পাবার জন্যে। মূলত কর্পোরেট লেভেলের কথা চিন্তা করেই বানানো হয়েছিল এটি। অনেকেই মুখের ওপর সত্যি কথা বলতে লজ্জা পান, নিজেদের মতামত বা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে পারেন না ঠিকভাবে। কর্মীদের কাজের মূল্যায়ন এবং জবাবদিহিতার কথা ভেবেই ছোট পরিসরে যাত্রা শুরু সারাহাহ-এর। গুগল প্লেস্টোর বা আইফোনের অ্যাপস্টোর থেকে নামিয়ে নিয়ে নিজের অ্যাকাউন্ট খুলে ব্যবহার করা যাবে সারাহাহ, পরিচিত কারো অ্যাকাউন্ট খুঁজে বের করে তাকে প্রশ্ন করা যাবে। তবে যাকে প্রশ্ন করা হচ্ছে তিনি সরাসরি অ্যাপে উত্তর দিতে পারেন না, বরং অন্য কোন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেটি শেয়ার করে উত্তরটা দিতে পারেন। এখানে প্রশ্নকর্তার পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রাখার কথা বলা হয়েছে নির্মাতার পক্ষ থেকে।

সারাহাহ’র বর্তমান ও ভবিষ্যত

গত এক সপ্তাহ ধরে প্রায় পঁচিশটি দেশে আইফোন ব্যবহারকারীদের সর্বোচ্চ ডাউনলোড করা অ্যাপের তালিকায় এক নম্বরে আছে সারাহাহ, বিশ্বজুড়ে একই সময়ে ফেসবুক-টুইটার-ইনস্টাগ্রামকে পেছনে ফেলে গুগল প্লেস্টোরে ডাউনলোড হওয়া পঞ্চম সর্বোচ্চ অ্যাপের নামও সারাহাহ। স্বল্প সময়েই দারুণ জনপ্রিয়তা সঙ্গী হয়েছে অ্যাপটির। বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা স্বত্বেও ব্যবহারকারীরা ঝুঁকছেন সারাহাহ-এর প্রতি, সময়ের সাথে সাথে নিজেকে আপডেট রাখতে পারলে জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পারবে এটি, সেটা বলে দেয়া যায়। একটা প্রশ্ন করেই আলাপচারিতা শেষ করতে হয়, এই ব্যপারটা ভোগাতে পারে সারারাহকে, কনভার্সেশন বা চ্যাটিং উইন্ডো ঘরানার কিছু যোগ করা হলে এর জনপ্রিয়তা বাড়বে বলে ধারনা করছেন বিশেষজ্ঞরা। যদিও এর সাস্টেইনেবিলিটি নিয়ে আছে সংশয়।

নির্মাতার কথা

একটা অনলাইন নিউজপোর্টালকে বলছিলেন জায়ান আল আবিদিন তৌফিক-

“আমাদের সমাজে বয়সের একটা দেয়াল থাকে, সম্পর্কের প্রাচীর থাকে, কর্মক্ষেত্রে উচু-নীচু অবস্থানের একটা ভেদাভেদ থাকে। চাইলেও আপনি মনই খুলে কারো সম্পর্কে মতামত দিতে পারবেন না সবসময়, তাতে আপনার দিকে অভিযোগের আঙুল তোলা হবে। বয়স্ক কারো সম্পর্কে আপনি কি ভাবেন, তাঁর কোন ব্যাপারটা আপনার ভালো বা খারাপ লাগে, সেটা অনেক সময়েই আমরা বিধিনিষেধের বেড়াজালে আটকে গিয়ে বলতে পারি না, কর্মী হয়ে বসের ভুলটা ধরিয়ে দিতে পারি না, কিংবা সম্পর্ক নষ্ট হবে ভেবে অনেককিছুই চুপ করে মেনে নিই। তাতে ক্ষতিটা দুই পক্ষেরই হয়। এসব ভেবেই আমার ওয়েবসাইটের যাত্রা শুরু, যেখানে পরিচয় গোপন রেখে আপনি পরিচিতদের ভুল ধরিয়ে দিতে পারছেন, তাঁর কাজের সমালোচনা বা প্রশংসা করতে পারছেন। আপনার পরিচয়টা মূখ্য নয় এখানে, মূল বিষয়টা হলো অজানা কারো প্রশংসা বা সমালোচনায় অন্যপাশের মানুষটা ভালো কাজ করতে উৎসাহী হয় কিনা সেটা…।”

ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামের প্রতিদ্বন্দ্বী কি হতে পারবে সারাহাহ?

এই ব্যপারে কথা বলার সময় এখনও আসেনি বোধহয়। স্বল্প সময়ে আগেও অনেক অ্যাপই জনপ্রিয়তা কামিয়েছে, হয়তো সেটার পরিমাণ সারাহাহ এর সমান ছিল না। তবে নতুনত্ব দিয়ে বাজিমাত করেছিল অনেকেই। কিন্ত সেই নতুনত্ব ফিকে হতে সময় লাগেনি। প্রতিযোগিতামূলক এই ক্ষেত্রটিতে নিত্যনতুন সম্ভার হাজির না করলে টিকে থাকা দায়। সারাহাহ ফার্স্ট ইম্প্রেশনে মন জয় করেছে অনেকেরই, কিন্ত এক জিনিসে ব্যবহারকারীদের বিরক্তি আসবে খুব দ্রুতই, এই জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়তেও সময় লাগবে না বেশী। নতুন বা আকর্ষণীয় ফিচার যোগ করা না হলে সারাহাহকেও আস্ক.এফএম, Yik-Yak বা Whisper এর পরিণতিই বরণ করতে হবে সারাহাহকে।

সারাহাহ অ্যাপ কি সিকিউরড?

লিখেছেন সাইবার সিকিউরিটি স্পেশালিস্ট- তামজীদ রহমান লিও  

প্রথম সমস্যা হলো রেজিস্ট্রেশনের সময় “agree to terms of service” বক্সে ক্লিক করার পর আপনি এর প্রাইভেসি পলিসি পড়তে পারবেন, এর আগে নয়। অর্থাৎ চোখ বন্ধ করে দলিলে সিগনেচার নিয়ে এরপর দেখাচ্ছে যে দলিলে কি লেখা যা মোটেও যুক্তিসংগত নয়। এই থার্ড পার্টি অ্যাপটি স্ন্যাপচ্যাট অ্যাপের সাথে খুব সহজে সিনক্রোনাইজ হয়, অথচ স্ন্যাপচ্যাটের টার্মস এন্ড কন্ডিশনসে পরিস্কার করে বলা আছে যেকোনো থার্ড পার্টি অ্যাপ যদি স্ন্যাপচ্যাটের সাথে সিনক্রোনাইজড হয়, এতে ইউজারের তথ্য চুরি হতে পারে যার জন্য স্ন্যাপচ্যাট দায়ী নয়। সারাহাহ অ্যাপের প্রাইভেসি পলিসি আবার খুব সুন্দর! সেখানে পরিস্কার করে লেখা আছে যে তারা ইউজারের প্রাইভেসি দেবে এবং তথ্য বিক্রয় করবে না যদিনা কোন লিগ্যাল অথরিটি চায়। মজার ব্যাপার হল নিচের দিকে একটি অপশনে লেখা আছে যা তারা চাইলে ভবিষ্যতে প্রাইভেসি পলিসি বা টার্মস কন্ডিশনস পরিবর্তন করার অধিকার রাখে। কী অদ্ভুত! এটি নামকরা কোন প্রতিষ্ঠানের অ্যাপ নয়, একক মালিকানাধীন একটি অ্যাপ এবং মালিক চাইলে ইউজারের ইনফো দিয়ে যা খুশি করতে পারেন! সুতরাং, সিদ্ধান্ত আপনার।

Please comment Here (ভাল লাগলে কমেন্ট করুন)