বর্তমান তথ্য প্রযুক্তির যুগে গুগলের নাম শোনেননি এমন কোনো ব্যক্তি পাওয়া যাবে না মনে হয়। তবে আমাজনের জঙ্গলে আদিবাসিদের মধ্যে হয়তো পাওয়া যেতে পারে হয়তো বা! আজ আমি আপনাদের জন্য নিয়ে এসেছি গুগলের কিছু অন্যরকম তথ্য যেগুলো হয়তো আমি জানেন না!  ল্যারি পেজ ও সের্গেই ব্রিন ১৯৯৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বর গুগল প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে কয়েক বছর ধরে গুগলের জনপ্রিয়তা বাড়াতে ব্যার্থ হওয়া তারা এক পর্যায়ে গুগল বেঁচে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

তবে তার আগে শেষ প্রচেষ্ঠা হিসেবে ২০০৪ সালে গুগল সার্চ ইঞ্জিণকে পাবলিক হিসেবে উন্মুক্ত করে দেয়। পরে সাফল্যে ধারা অব্যাহত থাকে গুগলের। বর্তমানে গুগলের আমেরিকায় একটি নিজস্ব হেডকোয়াটার রয়েছে। প্রথমে গুগল শুধু মাত্র সার্চ ইঞ্জিণ হিসেবে ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে আমরা গুগল ম্যাপস, জিমেইল বা গুগল ইমেইল, গুগল টান্সলেইট, গুগল ড্রাইভ, গুগল ক্রোম, গুগল ক্যালেন্ডার, গুগল প্লাস এবং ভিডিও শেয়ারিং ওয়েব সাইট ইউটিউব সহ এ জাতীয় অনেক কিছুর সুবিধা উপভোগ করতে পারছি।

এবার তাহলে চলুন আমরা গুগল সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনে যা হয়তো আপনাদের অজানা রয়েছে। গুগল সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনে নেই আসুন:

১. ব্যাকরাব!

আপনি জানেন কি? গুগল নির্মাণের সময় এর নাম Backrub রাখা হয়েছিল! কারণ প্রতিষ্ঠাতারা কোনো ওয়েবসাইটের ব্যাক সাইটকে বিশ্লেষণ করে গুগলে সেটার গুরুর্ত্বতা যাচাই করার জন্য প্রথমে মুলত এই গুগল সুবিধাটি নির্মাণ করেন। এই ব্যাকরাপ নামে প্রায় ১ বছর চলার পর তারা গুগল কে নতুন নাম হিসেবে নির্বাচন করেন।

২. GOOGOL!

গুগল বা google নামটি ম্যাথমেটিক্যাল টার্ম googol থেকে নেওয়া হয়েছে। ল্যারি পেইজ এবং সের্গেই ব্রিন গুগলে জন্য নতুন নাম খোঁজার জন্য বিভিন্ন আইডিয়া ঘাঁটতে ঘাঁটতে তারা ম্যাথমেটিক্যাল টার্ম googol থেকে অনুপ্রেরণা পেয়ে যান। googol হচ্ছে ১ এবং এর পরে ১০০ টি ০ দিয়ে তৈরি একটি টার্ম। googol থেকে তারা সরাসরি google য়ে পৌছাতে পারেন নি। তারা প্রথমে googol থেকে googol-plex শব্দটি বেছে নেন কিন্তু পরে gogol নাম হবে বলে সিদ্ধান্ত নেন। তবে gogol নামের ডোমেইনটি তখন অলরেডি বিক্রি হয়ে গেছে বিধায় তারা উচ্চরণে একই শব্দ google কে বেছে নেন সাইটের নাম হিসেবে।

৩. Im Feeling Lucky!

গুগলের সাইটে যাবার পর আপনি খেয়াল করলে দেখতে পাবেন যে তাদের সাইটে সব সময়ই একটি Im feeling lucky! নামের একটি বাটন থেকে থাকে। আর এর ফিচারের জন্য গুগলকে প্রতি বছর ১১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করতে হত। কিন্তু বর্তমানে এই ফিচারকে সার্চ বক্সেই নিয়ে এসেছে গুগল। এবার আপনি লক্ষ্য করে দেখবেন যে গুগল সার্চ বক্সে কোনো কিছু টাইপ করলেই এর পরের সম্ভাব্য শব্দ গুগল আপনার জন্য সাজেস্ট করবে! এটাই im feeling lucky ফিচারের নতুন সংষ্করণ!

৪. ডিক্টশনারিতে গুগল যোগ হওয়াতে গুগলের ফাউন্ডাররা খুশি ছিলেন না!

২০০৬ সালে অক্সফোর্ড ইংরেজি ডিক্টশনারিতে গুগল (google) শব্দটি যুক্ত করে দেয় কিন্তু এই বিষয়ে গুগলের ফাউন্ডাররা খুশি ছিলেন না। কারণ গুগল নামের মধ্যেই ইংরেজি মিসস্পেলিং রয়েছে। এছাড়াও গুগল শব্দটি ডিক্টশনারিতে এসে গেলে সবাই এই শব্দটি ব্যবহার করা শুরু করবে এবং তাদের কোম্পানির ভ্যালু কমে যাবে। যেটা পরবর্তীতে ভূল বলে প্রমাণিত হয়েছিল।

৫. মোস্ট ভ্যালুয়েবল ব্রান্ড!

২০১৭ সালে গুগল জনপ্রিয় টেক জায়ান্ট অ্যাপেলকে ছাড়িয়ে গিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে ভ্যালুযুক্ত ব্রান্ড হিসেবে নিজেকে স্থান করে নিয়েছে! ২০১১ সাল থেকে অ্যাপল বিশ্বের সবচেয়ে ভ্যালুযুক্ত ব্রান্ড হিসেবে নিজের স্থানকে ধরে রেখেছিল কিন্তু গুগল সেটাকে নিজের করে নিয়ে নেয় চলতি বছরে।

৬. প্রথম ডুডল!

আমরা লক্ষ্য করলে দেখতে পাবো যে কোনো বিশেষ দিবসে গুগলের সার্চ পেজে গুগলে লোগোকে উক্ত দিবসের অনুযায়ী আলাদাভাবে বিশেষ করে সাজানো হয়ে থাকে। এগুলোকে ডুডল বলা হয়। বর্তমানে গুগলের প্রায় দুই হাজারের বেশি ডুডলস রয়েছে। আপনি জানেন কি গুগলের প্রথম ডুডল ছিলো বার্নি ম্যান! ১৯৯৮ সালের বার্নি ম্যান ফেস্টিভাল থেকে ল্যারি পেইজ এবং সের্গেই ব্রিন তাদের প্রথম গুগল ডুডলের ইন্সপারেশন পেয়ে থাকেন।

৭. নাসার সাথে চুক্তি!

গুগল নাসার সাথে একটি টেকনোলজির চুক্তি করে। গুগলের অনেকগুলো প্রাইভেট জেট প্লেন ছিলো যেগুলোকে ল্যান্ড করার জন্য নিজস্ব রানওয়ের দরকার হতো। তাই গুগল নাসাতে বাৎসরিক ১.৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং গুগলের ড্রোন ব্যবহার করে নাসার তথ্য সংগ্রহের বিনিময়ে তাদের কাছ থেকে আমেরিকার সিলিকন ভ্যালিতে নিজস্ব একটি প্লেন রানওয়ে কিনে নেয়। এছাড়াও ২০০৮ সালে গুগল নাসার সাথে আরেকটি চুক্তি করে যেখানে ৪০ বছরের জন্য গুগলের নতুন গুগলপ্লেক্স তৈরি করার জন্য ৪২ একর জমি কিনে নেয়।

৮. ভূলের গুণ!

গুগল ডোমেইনের শব্দটি নিজেই GOOGOL শব্দের একটি ভূল বানানের রূপ! তাই গুগল তার নামের আশেপাশে মিল খায় এমন প্রায় ১৪০০টি ডোমেইন কিনে রেখেছে যাতে ভুল এড্রেস লিখলেও ব্যবহারকারী গুগলের পেজে চলে আসে। যেমন gogle.com gooogle.com  ইত্যাদি।

৯. ছাগল ভাড়া!

গুগলের হেডকোয়াটারের জমিকে পরিস্কার পরিছন্ন রাখতে গুগল প্রতি সপ্তাহে প্রায় ২০০টি ছাগল ভাড়া করে থাকে। গুগল একটি পরিবেশ বান্ধব কোম্পানি। তাই তাদের হেডকোয়াটারের আশেপাশের জায়গাগুলোকে ন্যাচারাল ভাবে পরিস্কার ও পরিছন্ন রাখতে গুগল এই সকল ছাগলের সাহায্য নিয়ে থাকে। ছাগল জমি থেকে ঘাঁসের সাথে সাথে যাবতীয় আগাছা এবং অনান্য গাছ জাতীয় জিনিস খেয়ে জমিগুলোকে উর্বর এবং পরিস্কার করে রাখে।

১০. ২.৩ মিলিয়ন প্রতি সেকেন্ড!

পুরো বিশ্বে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২ দশমিক ৩ মিলিয়ন গুগল সার্চ করা হয়ে থাকে। তাহলে বুঝুন গুগলের কি পরিমানের ব্রান্ডউইথ এবং হোস্টিং পাওয়ারের দরকার হয়! ২০১৬ সালের শেষের দিকে একটি রির্পোট অনুযায়ী জানা যায় যে প্রতি মাসে প্রায় ১০০ বিলিয়নের বেশি গুগল সার্চ করা হয়ে থাকে। আর ২ ট্রিলিয়নের বেশি সার্চ করা হয় প্রতি বছরে।

১১. স্ট্যান্ডফোর্ড রুলস!

স্টান্ডফোর্ড ইউনিভার্সিটি গুগলের পেইজ র‌্যাঙ্ক এলগোরিদমের প্যাটেন্ট রাইটসের মালিকানা সংরক্ষণ করে থাকে। স্ট্যান্ডফোর্ডের আদি নিয়ম অনুযায়ী বলা রয়েছে যে, স্ট্যান্ডফোর্ডে অধ্যাণরত অবস্থায় এর কোনো স্টুডেন্ট যদি ব্যবসায়জনক কোনো কিছু শুরু করে বা আবিস্কার করে তাহলে সেটার প্যাটেন্ট রাইটসের মালিক স্টুডেন্ট না হয়ে বরং স্ট্যান্ডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের হবে। গুগলের মূল চালিকাশক্তি এই পেইজ র‌্যাস্ক এলগোরিদম। তবে গুগল স্ট্যান্ডফোর্ডের সাথে ১.৮ মিলিয়ন শেয়ারের একটি চুক্তির মাধ্যমে ওই পেইজ র‌্যাস্ক এলগোরিদমের এক্সুসিভ একসেস নিয়ে নিয়েছে।

১২. ২.৭ বিলিয়ন ডলারের ফাইন!

২০১৭ সালের জানয়ারীতে গুগলের বিরুদ্ধে এন্টিট্রাস্ট ল’য়ের ভায়োলেশনের জন্য প্রায় ২.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের জরিমানা করা হয়। ইউরোপিয়ন ইউনিয়নের রেগুলেটরা এই জরিমানাটি ফাইল করেন। তাদের তথ্য মতে ইউরোপের বেশ কটি শপিং মলের জন্য গুগল তার সার্চ পেজে আলাদা ভাবে ফিচার রেজাল্ট স্থাপন করে এন্টিট্রাস্ট ল টি ভেঙ্গে ফেলেছিলো।

তথ্য প্রযুক্তি এই যুগে এটাই হলো সবথেকে বেশি জরিমানার পরিমান। তবে এই ২.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার গুগলের ২০১৬ সালের আয়ের মাত্র ২.৫ % বহন করে! তবে গুগল আদালতে এই ব্যাপারে আপিল করেছে এবং বিষয়টি এখন আদালতে বিচারাধিন অবস্থায় রয়েছে। এর আগে সবোর্চ্চ জরিমানা হিসেবে ইন্টেলের রেকর্ড ছিল। ২০০৯ সালে ইন্টেলের বিরুদ্ধে এন্টিট্রাস্ট লয়ের প্রায় ১.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার জরিমানা করা হয়েছিল।

১৩. অদ্ভূত এবং ইউনিক!

আপনি লক্ষ্য করে দেখবেন যে গুগলের সাইটে আপনি অনেকগুলো ভাষার চয়েজ করে নিতে পারবেন। সেখানে গিয়ে আপনি বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি, তামিল সহ পৃথিবীর ইউনিক এবং অদ্ভুত ভাষাগুলোও গুগলে ভাষা হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন।

১৪. এক মিলিয়ন ডলারের বাজিমাত!

১৯৯৯ সালে গুগলের ফাউন্ডাররা গুগলকে বেঁচে দেবার জন্য Yahoo, ALtavista, Exicite এর মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠানের কাছে গিয়েছিলেন। কিন্তু মাত্র ১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিময়েও তারা তখন গুগলকে এদের কাছে বিক্রি করতে সক্ষম হয় নি।

পরবর্তীতে ২০০৪ সালে আবারো এরা ইয়াহুকে গুগল কিনে নেবার জন্য ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের অফার দেন কিন্তু ইয়াহু কোম্পানি এই অফারটি গ্রহণ করেনি। বর্তমানে ২০১৭ সালে এসে গুগলের নেট ভ্যালু প্রায় ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে!

১৫. প্রথম দিকের এঞ্জেল ইনভেস্টর!

পৃথিবী সবচেয়ে বৃহৎ অনলাইন শপিং রিটেইলার আমাজন ডট কমের ফাউন্ডার, চেয়ারম্যান এবং চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার জেফ বেজস ছিলেন গুগলের প্রথম দিকের ইনভেস্টরদের মধ্যে একজন! গুগলের প্রথম এঞ্জেল ইনভেস্টর হলেন Sun Microsystems এর co-founder Andy Bechtolsheim. তিনি ১৯৯৮ সালে গুগলে ১০০০০০ ডলার ইনভেস্টমেন্ট করেন যখন গুগল ইনকরপরেশন হিসেবে ফরমও করে নি। সেই বছরই বেজফ গুগলে একটি লাভজনক প্রজেক্ট ভেবে নিয়ে এতে ১৯৯৮ সালে 250000 ডলার বিনিয়োগ করেন। তার দেখাদেখি গুগল প্রজেক্টে আরো বেশ কয়েকজন ইনভেস্ট করে তখনকার সময়ে গুগলের কার্যক্রমকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন।

গুগলের এই সব অজানা তথ্য আপনাদের নিশ্চই ভালো ও আনন্দদায়ক করে তুলেছে!

প্রয়োজনীয় হলে পোস্টটি শেয়ার করুন।
ধন্যবাদ, itdoctor24.com এর সাথেই থাকুন।

Please comment Here (ভাল লাগলে কমেন্ট করুন)